সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোতে সুযোগ-সুবিধায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও মোবাইল ভাতা বাড়ছে। প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন ভাতা চালু হচ্ছে। তবে বাংলা নববর্ষের ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদিত হয়েছে এবং প্রজ্ঞাপন জারির কাজ করছে অর্থ বিভাগ। মূল বেতন ও নিট পেনশন চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতায় বড় লাফ
নতুন কাঠামোয় ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় গ্রেডভেদে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত এই ভাতা দেওয়া হবে। চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক নতুন কাঠামো চালু হচ্ছে, ৫০ বছর পর্যন্ত মাসে ৩ হাজার টাকা, ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার, ৬০ থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ভাতাও বাড়বে, যা বয়স্ক কর্মচারীদের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়।
যাতায়াত, টিফিন ও মোবাইল ভাতায় সুখবর
যাতায়াত ভাতা বর্তমানে ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, অর্থাৎ দ্বিগুণ করা হয়েছে। টিফিন ভাতা ২০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন, গ্রেড-৫ ও এর ঊর্ধ্বে ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-৬ ও এর নিচের গ্রেডে ১৫০ টাকা। এছাড়া নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে। গ্রেড-৬ ও এর নিচের গ্রেডে ৫ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও ৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন সুবিধা ও কাটছাঁট
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন করে মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। সর্বোচ্চ দুই সন্তান এই সুবিধার আওতায় আসবেন। তবে বাংলা নববর্ষের ভাতায় কাটছাঁট করা হয়েছে. বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে দেওয়া হলেও নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে নির্ধারণের পাশাপাশি ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা ক্ষেত্রবিশেষে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে শিক্ষা সহায়ক, কার্যভার, আপ্যায়ন ও উৎসব ভাতা আগের হারেই বহাল থাকবে। পাহাড়ি এলাকার সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকা। হাওড়, দ্বীপ ও চর এলাকায়ও ২০ শতাংশ হারে ভাতা আগের মতোই থাকবে, তবে সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা।
পেনশন ও সামরিক বাহিনীর ভাতায় পরিবর্তন
‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নিট পেনশনের নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন নিট পেনশন ১০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা হবে। সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিভিন্ন ভাতাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশির ভাগ ভাতার বিদ্যমান পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
এই নতুন বেতন কাঠামো শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে বাড়তি টাকা এলে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়বে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনতে পারে। তবে একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও সরকারের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ সরকারি বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়বে। এখন দেখার বিষয়, নতুন কাঠামো কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং বাস্তবে কর্মচারীরা কতটা সুবিধা পান।

