দৈনিক সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির পরিবারের পাওনা ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে পত্রিকাটি। বরিশালের সমকাল কার্যালয়ে তার মরদেহ উদ্ধারের তিন দিন পর, ১৪ সেপ্টেম্বর পুলকের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জির ব্যাংক হিসাবে ওই অর্থ জমা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সমকালের বর্তমান বরিশাল ব্যুরোপ্রধান সুমন চৌধুরী।
৫৭ বছর বয়সী পুলক চ্যাটার্জিকে গত ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর পরারা রোডে অবস্থিত সমকাল কার্যালয়ের ভেতর থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারণা করছে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে উদ্ধার করা চিরকুটগুলোর সত্যতা যাচাই এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলক চ্যাটার্জি দীর্ঘদিন বরিশালের সাংবাদিকতায় সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় গণমাধ্যম অঙ্গনে তার পরিচিতি ছিল। তিনি একসময় বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সমকালে তিনি বরিশাল ব্যুরোপ্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। তবে ২০২৩ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর আর নিয়মিত কর্মসংস্থানে ফিরতে পারেননি তিনি।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পর পুলক দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরনের মানসিক চাপে ছিলেন। বেকারত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তার জীবনে প্রভাব ফেলেছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তবে তার মানসিক অবস্থার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য ও তদন্তের ফল বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মৃত্যুর আগে পুলক পাঁচটি চিরকুট লিখে গেছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি চিরকুটে তিনি দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর কাছে সমকাল কার্যালয়ে থাকা তার পাওনা অর্থ উদ্ধারের অনুরোধ করেছিলেন। একই সঙ্গে ওই টাকা পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর পুলকের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জির ব্যাংক হিসাবে ১০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। ফলে মৃত্যুর আগে পাওনা অর্থ নিয়ে পুলক যে অনুরোধ করেছিলেন, তার তিন দিনের মধ্যেই সেই অর্থ পরিবারের হাতে পৌঁছেছে।
পুলক স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা এবং একমাত্র মেয়ে প্রকৃতিকে রেখে গেছেন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাদের উদ্দেশে লেখা একটি চিরকুটও উদ্ধার হয়েছে। সেখানে তিনি পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানা গেছে। একইভাবে ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জিকেও স্ত্রী ও মেয়ের দেখাশোনার অনুরোধ করেছিলেন বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে।
পুলকের মৃত্যুর ঘটনা এরই মধ্যে বরিশালের সাংবাদিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় সক্রিয় থাকা একজন পেশাজীবী চাকরি হারানোর পর কী ধরনের আর্থিক ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষ করে সাংবাদিকতা পেশায় চাকরির অনিশ্চয়তা, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব এবং পারিবারিক দায়বদ্ধতার মতো বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকে শুধু একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। পুলকের ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি—সবকিছু তদন্তের মাধ্যমে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উদ্ধার হওয়া চিরকুটের বক্তব্যও তদন্তের একটি অংশ মাত্র; এগুলোর সত্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা চিরকুটগুলো প্রকৃতপক্ষে পুলকের লেখা কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। পাশাপাশি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তদন্তের এসব ধাপ শেষ হওয়ার আগে ঘটনাটিকে চূড়ান্তভাবে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
পুলকের মৃত্যুর তিন দিনের মধ্যে পরিবারের পাওনা অর্থ পরিশোধের বিষয়টি তার শেষ অনুরোধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এই ঘটনা দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার পর একজন কর্মহীন মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
তার পরিবার এখন প্রিয়াঙ্কা ও মেয়েকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। আর পুলকের মৃত্যুর কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সত্য জানতে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলের দিকেই তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্টরা।

