সরকারি অর্থে চালিত উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ি নিয়ম ভেঙে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার জন্য ব্যবহারের একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের গাড়ি শুধু সেই প্রকল্পের কাজেই ব্যবহার করার কথা এবং প্রকল্প শেষে তা সরকারি পরিবহন পুলে ফেরত দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে ঘটছে ঠিক তার বিপরীত।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার শীর্ষ থেকে মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তারা দিনের পর দিন এই গাড়িগুলো ব্যক্তিগত সুবিধায় চালিয়ে যাচ্ছেন, আর প্রশ্ন করা হলে একেকজন একই ধরনের জবাব দিচ্ছেন— এটা তো একা তিনি করছেন না।
স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন যুগ্ম সচিবের ঘটনাটি এই অনিয়মের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। প্রায় চার বছর আগে সরকারের সুদমুক্ত ঋণ সুবিধায় নিজের গাড়ি কিনেছেন তিনি, সঙ্গে প্রতি মাসে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকার থেকে পাচ্ছেন পঞ্চাশ হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে তিনি নিয়মিত ব্যবহার করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি বিশ্বব্যাংক-অর্থায়িত গ্রামীণ সেতু প্রকল্পের এসইউভি গাড়ি, যার চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ— সবই মেটাচ্ছে সরকার। এমন দুই গাড়ির সুবিধা নেওয়া কর্মকর্তার সংখ্যা কম নয়— অনুসন্ধানে অন্তত পঁয়ত্রিশ জন কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা একই সঙ্গে সুদমুক্ত গাড়িঋণ, মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা এবং এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি— এই তিনটি সুবিধাই ভোগ করছেন।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করা এলজিইডির হাতে বর্তমানে সারা দেশে সোয়াশোর বেশি প্রকল্প চলমান। এসব প্রকল্পের আওতায় কেনা হয়েছে শত শত গাড়ি, যার প্রকৃত সংখ্যা জানতে চাইলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে সংগৃহীত একটি তালিকা থেকে জানা গেছে, আড়াইশর বেশি গাড়ির মধ্যে সিংহভাগই এসইউভি ধরনের, বাকিগুলো পিকআপ ও সাধারণ কার। এই গাড়িগুলোর একটি বড় অংশ— প্রায় ষাটটি— এলজিইডি নিজে ব্যবহার না করে বিলিয়ে দিয়েছে অন্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে।
সবচেয়ে বেশি গাড়ি পেয়েছে স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিভাগ ও মন্ত্রণালয়— মিলিয়ে তিন ডজনের কাছাকাছি। এর বাইরে পরিকল্পনা কমিশন, আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়, একটি সিটি করপোরেশন এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনও পেয়েছে এই প্রকল্পের গাড়ি। তালিকায় দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগে সচিব থেকে শুরু করে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব এবং জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব পর্যায় পর্যন্ত অনেকেই এই গাড়ি ব্যবহার করছেন। একই চিত্র পরিকল্পনা কমিশনেও— সদস্য, বিভাগীয় প্রধান, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নামেও রয়েছে এলজিইডির গাড়ি।
দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবস্থায় একধরনের পরস্পর-সুবিধা দেওয়ার সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কারণ পরিকল্পনা কমিশন যেমন এলজিইডির প্রকল্প পাস করার দায়িত্বে থাকে, তেমনি দুর্নীতি দমন সংস্থাটির কাজই হলো এমন অনিয়ম তদারকি করা। এই দুই সংস্থার কর্মকর্তারাই যখন এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই জবাবদিহির জায়গায় প্রশ্ন ওঠে। একটি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার প্রধান নির্বাহী এই প্রবণতাকে যোগসাজশমূলক অনিয়ম বলে অভিহিত করে মন্তব্য করেছেন, বিপুল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত একটি সংস্থা যখন অন্য সংস্থার কর্মকর্তাদের এমন সুবিধা দেয়, তখন তার পেছনে পরস্পর সুরক্ষার সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পরিকল্পনার কমিশনের সংশ্লিষ্ট এক বিভাগীয় প্রধানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, গাড়িটি কেবল প্রকল্প-সংক্রান্ত কাজেই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেই গাড়িতেই তিনি নিয়মিত অফিসে যাতায়াত করেন। আরেকজন বিভাগীয় প্রধান প্রশ্নের জবাবে বলেন, তিনি একা এই ব্যবস্থা চালু করেননি এবং অন্যরাও তো একইভাবে ব্যবহার করছেন— এই যুক্তিতেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তিনি।
সবাই যে এই সুবিধা নিয়েছেন তা নয়। স্থানীয় সরকারের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এলজিইডির প্রস্তাবিত গাড়ি প্রত্যাখ্যান করে সরকারি পরিবহন পুলের গাড়িই ব্যবহার করছেন বলে জানা গেছে। প্রতিমন্ত্রীও এই প্রকল্পের গাড়ি নেননি, যদিও তাঁর দপ্তরের একান্ত সচিব ও সহকারী একান্ত সচিব এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করছেন।
এই অনিয়ম নতুন কিছু নয়। এর আগে সাবেক এক স্থানীয় সরকার সচিবের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে তিনটি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল, যিনি এখন কারাগারে আছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কোনো প্রথা এমনিতেই বৈধতা পেয়ে যায় না।
জনপ্রশাসন সংক্রান্ত সরকারি দপ্তর থেকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে কর্মকর্তাদের এই অনিয়ম বন্ধ করে গাড়ি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি বললেই চলে। এমনকি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরের অন্তর্বর্তী সরকারও একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছিল, কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তখনকার কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও একাধিক গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।
নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে চালু গাড়ি কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত কয়েক বছরে এলজিইডির শেষ হওয়া প্রকল্পগুলোর কতটি গাড়ি ফেরত এসেছে, তার কোনো সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলো থেকে গত চার বছরে হাতেগোনা কয়েকটি গাড়ি ফেরত জমা পড়ার তথ্যই মিলেছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম দূর করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর সিদ্ধান্ত। শুধু চিঠি চালাচালি বা নির্দেশনা জারি করে এই সংস্কৃতি বদলানো সম্ভব নয়, বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন সাবেক আমলারা।
সামগ্রিকভাবে এই অনুসন্ধান দেখায়, উন্নয়ন প্রকল্পের সম্পদ কীভাবে মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে প্রশাসনিক সুবিধাভোগের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। একদিকে সরকারি অর্থে বিনা সুদে ঋণ, মাসিক ভাতা— অন্যদিকে প্রকল্পের নামে কেনা গাড়ির অবাধ ব্যবহার— এই দ্বিমুখী সুবিধাভোগের সংস্কৃতি জনস্বার্থে ব্যয় হওয়া অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।

