রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে পরিচয়হীন মরদেহ। কারও পরিচয় শনাক্ত হলে স্বজনরা তা মর্গ থেকে নিয়ে যান, কিন্তু যাদের পরিচয় শেষ পর্যন্ত মেলে না, আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের দাফন-সৎকারের দায়িত্ব নেয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে— জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত— মোট ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করা হয়েছে, যা মাসিক গড়ে প্রায় পঞ্চাশটি। মাসভিত্তিক এই সংখ্যায় কিছুটা ওঠানামা দেখা গেছে— বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে ছিল ত্রিশটি, আর জুনে গিয়ে তা বেড়ে হয় সর্বোচ্চ সাতষট্টিটি। এসব মরদেহের সিংহভাগ, প্রায় সাড়ে তিনশটি, দাফন হয়েছে মোহাম্মদপুরের একটি কবরস্থানে, বাকিগুলোর বেশিরভাগ জুরাইনে এবং একটি সৎকার হয়েছে হিন্দু শ্মশানঘাটে।
তবে এই পরিসংখ্যান নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার। তাঁর ভাষ্য, এত বিপুল সংখ্যক মরদেহ বেওয়ারিশ থাকার কথা নয়, এবং এ বিষয়ে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। উল্লেখ্য, আগের দুই বছরে এই সংখ্যা ছিল আরও বেশি— একটি বছরে পাঁচশর বেশি এবং তার পরের বছরে ছয়শর বেশি মরদেহ দাফন-সৎকার করেছিল সংস্থাটি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর সড়ক, রেললাইন, ফুটপাত, পার্ক, নদী ও খাল থেকে প্রায় প্রতিদিনই অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এদের সবাই খুনের শিকার নন— সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া বা অসুস্থতায়ও মৃত্যু হয় অনেকের। এই মরদেহগুলোর একটি বড় অংশ ভবঘুরে, মানসিকভাবে অসুস্থ, গৃহহীন বা দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের, যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন না থাকায় শনাক্তকরণ কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে হত্যার পর মরদেহ বিকৃত বা খণ্ডিত করে ফেলার ঘটনাও ঘটে, যার ফলে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায় এবং পরিচয় নিশ্চিত করা পুলিশের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। সম্প্রতি সোমবারও রাজধানীর কয়েকটি এলাকা থেকে একজন নারীসহ পাঁচজনের অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত না হলে পুলিশ ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেও চেষ্টা চালায়। অর্ধগলিত মরদেহের ক্ষেত্রে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়, তবে মর্গে জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ সম্ভব হয় না, ফলে শেষমেশ দাফন করে দিতে হয়। সম্প্রতি একটি খাল থেকে একজন তরুণীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও এখনো পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুলিশের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া কোনো মরদেহই বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না— সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পরই মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
একজন মানবাধিকারকর্মীর পর্যবেক্ষণ, ঢাকায় উদ্ধার হওয়া বেওয়ারিশ মরদেহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃতপক্ষে হত্যাকাণ্ডের শিকার, কিন্তু এসব ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও বিচার প্রক্রিয়া কম হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে বলে তাঁর অভিমত। তাঁর মতে, হত্যার পর লাশ গুম করেও কেউ যাতে পার না পেয়ে যায়, সেটি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যাগত তথ্য নয়— এটি নগর জীবনের প্রান্তিক ও উপেক্ষিত এক বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করে, যেখানে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষদের মৃত্যুর পরও পরিচয় খুঁজে পাওয়ার সুযোগ থেকে যায় সীমিত।

