বাগেরহাটের রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেশের অন্যতম আধুনিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রের দুই ইউনিটের মালিকানা বাংলাদেশ ও ভারতের রাষ্ট্রীয় দুই প্রতিষ্ঠানের সমান অংশীদারিত্বে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের ৫০:৫০ মালিকানায় গঠিত বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি কেন্দ্রটি পরিচালনা করছে।
প্রথম ইউনিট বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। দ্বিতীয় ইউনিট বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে ২০২৪ সালের মার্চে। অর্থাৎ কেন্দ্রটি এখনো তুলনামূলকভাবে নতুন। কিন্তু বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর থেকেই এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে।
সর্বশেষ এক বছরের তথ্য আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই সময়ে রামপালের কোনো না কোনো ইউনিট ৩০ বার বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ বার বন্ধের পেছনে ছিল যান্ত্রিক বা কারিগরি সমস্যা। বাকি তিনবার উৎপাদন বন্ধের কারণ হিসেবে কয়লা সংকটের কথা বলা হয়েছে।
একটি আধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি বা নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদন বন্ধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু স্বল্প সময়ে এতবার অনির্ধারিতভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা কেন্দ্রটির নকশা, নির্মাণ, যন্ত্রাংশের মান, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে গভীরভাবে প্রশ্ন তোলার মতো।
আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন্দ্রটি উৎপাদন না করলেও নির্দিষ্ট চুক্তির আওতায় এর সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে একটি কেন্দ্র যতবার অপ্রত্যাশিতভাবে বন্ধ হয়, ততবারই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয় না; একই সঙ্গে জনগণের অর্থে পরিচালিত বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
শুরু থেকেই বারবার বন্ধ হওয়ার ঘটনা
রামপালের ঘনঘন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর মাত্র সাত মাসের মধ্যেই কেন্দ্রটি ছয়বার বন্ধ হয়েছিল।
১৬ জুলাই টারবাইনে ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। চার দিন পর সেটি আবার চালু করা হয়। এর দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর ৩০ জুলাই কয়লা সংকটের কারণে আবার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
সে সময় কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, কয়লা আসার পর ৮ আগস্টের দিকে উৎপাদন পুনরায় শুরু হতে পারে।
এরপর একই বছরের নভেম্বরেও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়। ডিসেম্বরে ইমপালস টিউবে ছিদ্র দেখা দেওয়ায় আবার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বরের ঘটনাটি ছিল বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর কেন্দ্রটির অষ্টমবার বন্ধ হওয়ার ঘটনা।
অর্থাৎ কেন্দ্রটি নতুন হওয়ার পর থেকেই শুধু জ্বালানি সংকট নয়, টারবাইন, বয়লার, টিউব, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে একাধিক সমস্যা সামনে এসেছে।
যন্ত্রাংশের মান নিয়েও প্রশ্ন
রামপালের যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয় কেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নথি দেখলে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি ২দ্ধ৬৬০ মেগাওয়াট রামপাল প্রকল্পের বয়লারের জন্য প্রতিরক্ষা আবরণ ও বয়লার টিউব সংগ্রহের দরপত্র প্রকাশ করে। এত অল্প সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বয়লার যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবর্তনের প্রয়োজন কেন হলো, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একটি নতুন ও আধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বয়লার টিউবের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু যন্ত্রের বয়সকে দায়ী করার সুযোগ নেই। তখন দেখতে হবে যন্ত্রাংশের গুণগত মান কেমন ছিল, নকশা ও নির্মাণে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, কেন্দ্র চালুর আগে পরীক্ষার প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ঘাটতি হয়েছে কি না।
পুরনো কেন্দ্র নয়, তবু এত ত্রুটি কেন?
রামপালকে কোনোভাবেই পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বলা যায় না। ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুই ইউনিট নিয়ে তৈরি এই কেন্দ্রকে আধুনিক অতিউচ্চচাপ প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তাই বাণিজ্যিক উৎপাদনের কয়েক বছরের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিতে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ার বিষয়টি বয়সজনিত স্বাভাবিক ক্ষয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
এখানে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—সমস্যাটি ঠিক কোথায়?
নকশায় কোনো দুর্বলতা ছিল? নির্মাণকাজে মান বজায় রাখা হয়নি? যন্ত্রাংশের মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে ছিল না? কেন্দ্র চালুর আগে যথেষ্ট পরীক্ষা করা হয়নি? নাকি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত রামপালের ঘনঘন বন্ধ হওয়ার প্রকৃত কারণ বোঝা সম্ভব নয়।
এ জন্য প্রতিটি অনির্ধারিত বন্ধের সময়, কারণ, ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ, মেরামত ব্যয় এবং কতক্ষণ উৎপাদন বন্ধ ছিল—এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের সময় এবং আকস্মিক বন্ধের সময় আলাদা করে হিসাব করা প্রয়োজন।
দুই অর্থবছরে ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা সক্ষমতা মূল্য
রামপাল নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি অর্থনৈতিক। কেন্দ্রটি কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং তার বিপরীতে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে—এই হিসাব সামনে আনলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রামপাল প্রায় ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ওই বছর বিদ্যুৎ বিক্রয় থেকে পাওয়া শক্তি মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে সক্ষমতা মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যে অর্থ পাওয়া গেছে, তার চেয়েও বেশি ছিল সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য পাওয়া অর্থ।
পরের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে কেন্দ্রটির উৎপাদন বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ইউনিটে দাঁড়ায়। সে বছর শক্তি মূল্য থেকে আয় ছিল প্রায় ২ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। আর সক্ষমতা মূল্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ওই বছর কেন্দ্রটির মোট আয়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ এসেছে সক্ষমতা মূল্য থেকে।
দুই অর্থবছর মিলিয়ে রামপাল প্রায় ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা সক্ষমতা মূল্য পেয়েছে। ৫০:৫০ মালিকানার হিসাবে এর প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা, ভারতীয় অংশীদার ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের মালিকানাধীন অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে সক্ষমতা মূল্যকে সরাসরি ‘বিদ্যুৎ না দিয়ে পাওয়া টাকা’ বলা ঠিক হবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্দিষ্ট সক্ষমতায় প্রস্তুত ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রস্তুত রাখার বিনিময়ে চুক্তি অনুযায়ী এই অর্থ দেওয়া হয়।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—একটি কেন্দ্র কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং সেই উৎপাদনের তুলনায় তার সক্ষমতা বাবদ কত অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে?
২০২৩-২৪ অর্থবছরে রামপালের মোট প্রাপ্তি ছিল প্রায় ৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা এসেছে সক্ষমতা মূল্য হিসেবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের হিসাবে মোট অর্থপ্রাপ্তি ছিল প্রায় ১৪ দশমিক ৮৯ টাকা। এর মধ্যে শুধু সক্ষমতা মূল্যের অংশ ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৪৯ টাকা।
এই হিসাবই রামপালের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
৫১ ভারতীয় কর্মীর পেছনে এক মাসে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা
রামপালের ব্যয়ের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো বিদেশি কর্মীদের পারিশ্রমিক।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একটি আর্থিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে রামপালে কর্মরত ৫১ জন ভারতীয় নাগরিককে মোট ১৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
গড়ে প্রত্যেকের মাসিক প্রাপ্তি দাঁড়ায় প্রায় ২৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে একজন ভারতীয় কর্মকর্তার সর্বোচ্চ মাসিক প্রাপ্তি ছিল ৪৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
এই অর্থের মধ্যে কর্মদক্ষতা ভাতা, ছুটি নগদায়ন এবং বিদেশি ভাতাও ছিল। শুধু ওই মাসেই কর্মদক্ষতা ভাতা বাবদ প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং বিদেশি ভাতা হিসেবে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রটি যখন প্রত্যাশিত সক্ষমতায় নিয়মিত উৎপাদন করতে পারছে না এবং এর আর্থিক চাপ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তখন এত বড় অঙ্কের কর্মদক্ষতা ভাতা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আরও একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটির শীর্ষ ৪০টি পদের মধ্যে ৩২টিতেই ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।
এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও প্রকৌশল খাতে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল থাকা সত্ত্বেও এত গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদেশি কর্মীর প্রয়োজনীয়তা কতটা? বিদেশি কর্মী রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের দায়িত্ব, দক্ষতা, পারিশ্রমিক এবং স্থানীয় জনবলের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
প্রকল্পের বিনিয়োগও ছিল বিশাল
রামপালের আর্থিক ঝুঁকি বুঝতে হলে শুধু পরিচালন ব্যয় দেখলে হবে না। প্রকল্পটি নির্মাণেই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২দ্ধ৬৬০ মেগাওয়াট প্রকল্পের প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ ঠিকাদার ছিল ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড। তাদের সঙ্গে চুক্তির মূল্য ছিল ১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
অর্থাৎ একটি বড় মূলধনী বিনিয়োগের পরও কেন্দ্রটি যদি ঘনঘন বন্ধ হয়, তাহলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব দিয়ে প্রকল্পটির সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়।
এখানে হিসাব করতে হবে পুরো জীবনচক্রের ব্যয়। প্রকল্প নির্মাণে কত অর্থ গেছে, কয়লা আমদানিতে কত খরচ হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটের প্রকৃত ব্যয় কত, সক্ষমতা মূল্য কত, রক্ষণাবেক্ষণে কত অর্থ যাচ্ছে এবং কেন্দ্রটি কত সময় কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
কয়লা সংকট কি একমাত্র কারণ?
রামপালের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কয়লা সংকটের ঘটনাও রয়েছে। ২০২৩ সালে ডলার সংকটের কারণে কয়লা আমদানির অর্থ পরিশোধে জটিলতা তৈরি হওয়ায় কেন্দ্রটি উৎপাদন বন্ধ করেছিল।
কিন্তু সর্বশেষ এক বছরে ৩০টি বন্ধের মধ্যে ২৭টির কারণ যদি যান্ত্রিক বা কারিগরি ত্রুটি হয়ে থাকে, তাহলে সমস্যাটিকে শুধু কয়লার সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
টারবাইন, বয়লার, টিউব এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির বারবার সমস্যাই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
তাই রামপালের ক্ষেত্রে প্রতিটি বন্ধের ঘটনা আলাদা করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোন ইউনিট কখন বন্ধ হয়েছে, কত ঘণ্টা বন্ধ ছিল, কোন যন্ত্রাংশে সমস্যা হয়েছে, মেরামতে কত টাকা লেগেছে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কোথা থেকে কেনা হয়েছে এবং ওই সময়ে কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি—এসব তথ্য প্রকাশ্যে থাকলে প্রকল্পটির বাস্তব চিত্র অনেক পরিষ্কার হবে।
এখন প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত
রামপালের সমস্যা শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বারবার বন্ধ হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়, সক্ষমতা মূল্য, জ্বালানি আমদানি, পরিচালন ব্যয় এবং বিদেশি জনবল ব্যবহারের মতো বড় বিষয় জড়িয়ে আছে।
সক্ষমতা মূল্য বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার স্বাভাবিক চুক্তির অংশ হতে পারে। কিন্তু কোনো কেন্দ্র যদি বারবার কারিগরি সমস্যায় বন্ধ থাকে, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং একই সময়ে বড় অঙ্কের সক্ষমতা মূল্য পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সেই চুক্তির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা অবশ্যই নতুন করে যাচাই করা দরকার।
রামপালের ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর প্রয়োজন।
প্রথমত, এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র বাস্তবে কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ দিতে পারছে?
দ্বিতীয়ত, দুই বছরে ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা সক্ষমতা মূল্য দেওয়ার বিপরীতে বাংলাদেশ কত বিদ্যুৎ পেয়েছে এবং সেই বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যয় কত?
তৃতীয়ত, ৫১ জন ভারতীয় কর্মীর পেছনে এক মাসে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী এবং একই ধরনের কাজের জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব দক্ষ জনবল কতটা ব্যবহার করা হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষা প্রয়োজন। প্রকল্পের নির্মাণ, নকশা, যন্ত্রাংশের মান, বয়লার ও টারবাইনের ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ, সক্ষমতা মূল্য, জ্বালানি ব্যয়, বিদেশি কর্মীদের পারিশ্রমিক এবং কেন্দ্রের প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে পরীক্ষা করা দরকার।
কারণ শেষ পর্যন্ত রামপাল নিয়ে প্রশ্ন শুধু এই নয় যে কেন্দ্রটি কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বড় প্রশ্ন হলো—বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়া এই কেন্দ্রের পেছনে জনগণের কত অর্থ যাচ্ছে এবং সেই অর্থের বিপরীতে বাংলাদেশ বাস্তবে কতটা সুবিধা পাচ্ছে।

