দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আবারও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান, জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সীমিত সক্ষমতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও দেশের বর্তমান জ্বালানি কাঠামো এখনো কয়েকটি প্রধান উৎসের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বা সরবরাহে কোনো পরিবর্তন হলে দেশের অর্থনীতি সরাসরি চাপের মুখে পড়ে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছরের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আর্থিক সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে বিদ্যুৎ খাতে বড় অগ্রগতি করেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল মাত্র ৫০০ মেগাওয়াট, ২০২৬ সালের মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াটে। দেশের প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।
তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে। চলতি বছরের মে মাসে সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট, যেখানে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৬১১ মেগাওয়াট। একই সময়ে শিল্প খাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ভোল্টেজ ওঠানামা এবং গ্যাস সংকটের সমস্যা দেখা গেছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় উদ্যোগ
বাংলাদেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত এখনো প্রধানত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
নতুন কৌশল অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাস কূপ খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
সমুদ্র অঞ্চলের গ্যাস অনুসন্ধানেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলা ২০২৬ সালের হালনাগাদ উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির আওতায় ২৬টি গভীর ও অগভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে।
তবে শুধু গ্যাস উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। সিলেট থেকে মেঘনাঘাট পর্যন্ত পাইপলাইন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দূর করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস কার্যকরভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভোলা থেকে ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তরলীকরণ ও পরিবহনের মাধ্যমে খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেখানে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে।
সৌরবিদ্যুতে বড় লক্ষ্য
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে দেখছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের সমান।
এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এক বছরের মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কারখানা, সরকারি ভবন, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ১৫ পয়সা নির্ধারিত মূল্য দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেখানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ আনুমানিক ৬ থেকে ৭ টাকা। পাশাপাশি সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে কর সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
তবে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। কারণ সূর্যের আলো নির্ভর এই বিদ্যুৎ সবসময় একই পরিমাণে পাওয়া যায় না। তাই বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আধুনিক গ্রিড প্রয়োজন।
সরকারি পরিকল্পনায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তবে গ্রিড সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বড় গ্রিডভিত্তিক সৌর প্রকল্পে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বাস্তবায়নের বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমানোর উদ্যোগ
বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো আর্থিক চাপ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বার্ষিক ক্ষতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ৫ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫০ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কেন্দ্র সবসময় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কাগজে থাকা সক্ষমতা ও বাস্তবে উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সক্ষমতা বাবদ সরকারকে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ দিতে হয়।
এই চাপ কমাতে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে বাস্তব খরচ বিবেচনা, চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আদানি বিদ্যুৎ চুক্তিসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।
এলএনজি আমদানিতে বিকল্প ব্যবস্থা
দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপরও নির্ভরতা থাকবে। তবে বর্তমানে এলএনজি অবকাঠামো মূলত মহেশখালীকেন্দ্রিক হওয়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই ঝুঁকি কমাতে কুতুবজোমে নতুন ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন ইউনিট এবং পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্ট এলাকায় সম্ভাব্য টার্মিনাল তৈরির বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর লক্ষ্য হলো একটি নির্দিষ্ট এলাকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও আধুনিক গ্রিড
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর প্রস্তুতির সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নও করা হচ্ছে। এর জন্য স্মার্ট ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ৭৬৫ কেভি দ্বৈত সার্কিট সঞ্চালন লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ভূমিকাও পুরোপুরি বাদ দেওয়া হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে চারটি দেশীয় কয়লাখনি উন্নয়ন এবং সরকারি পর্যায়ে সরবরাহ চুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানি তেল নিরাপত্তার জন্য ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট সম্প্রসারণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের ১০০ কোটি ৪ লাখ ডলারের ঋণ সহায়তায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে বছরে পরিশোধন সক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে এবং বছরে প্রায় ৪৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের আশা করা হচ্ছে।
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা
নতুন পরিকল্পনায় জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিক বিতরণের সুযোগ দেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিল্প খাতে নিজস্ব ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় গ্রিড থেকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট শিল্পভিত্তিক অদক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যুতের চাহিদা ব্যবস্থাপনায় রাতের সময় বৈদ্যুতিক যানবাহন চার্জিং উৎসাহিত করা হবে। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশের নতুন জ্বালানি পরিকল্পনা শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর করছে না। বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। গ্যাস অনুসন্ধান থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিড উন্নয়ন থেকে আর্থিক সংস্কার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময়মতো কাজ শেষ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো একক উৎসের ওপর নির্ভর করবে না। দেশীয় গ্যাস, সৌরবিদ্যুৎ, আমদানি অবকাঠামো, পারমাণবিক শক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল ভিত্তি।

