বাংলাদেশে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শুক্রবার নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা ও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। তবে সবারই এককথা-কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ধ্বংসপ্রায় নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব এএমএম নাসির উদ্দীন। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ আবদুর রহমানেল মাসুদ, সাবেক যুগ্ম সচিব তহমিদা আহমদ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তারা রোববার শপথ নেবেন।
নতুন কমিশনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানালেও বিরোধী দলগুলো সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করাই হবে কমিশনের আসল পরীক্ষা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “নির্বাচন কমিশন জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি নির্বাচন আয়োজন করবে, যেখানে ভোটাররা স্বাধীনভাবে তাদের মত প্রকাশ করতে পারবেন।” তিনি আরও বলেন, “যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা হয়, তবে এই কমিশনের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোও সহযোগিতা করবে।”
বিএনপির আরেক নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উল্লেখ করেন, “নতুন কমিশনের মাধ্যমে দেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। তবে কমিশন তাদের কাজ কতটা ভালোভাবে করতে পারবে, সেটি সময়ই বলে দেবে।” জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, “গত তিনটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। নতুন কমিশন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, “নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফেরানোই হবে নতুন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।” তার মতে, বিগত নির্বাচনগুলোয় কমিশন দলীয় অনুগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ায় জনগণের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক সাইফুল হক বলেন, “নতুন কমিশনের দায়িত্ব শুধু একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত নির্বাচন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় পুনর্গঠন করাও তাদের পবিত্র দায়িত্ব।” একই সুরে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার একটি ভালো নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা তার কথায় আশাবাদী। তবে পুরো প্রক্রিয়া সফল করতে কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও আন্তরিক সহযোগিতা করতে হবে।”
নতুন কমিশনের প্রতি আস্থা রেখেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, “আমরা এই কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে চাই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তে তাদের নিয়োগ দিয়েছে।”
১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের নেতা ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ উভয়ই বলেছেন, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করবে নতুন কমিশন। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে তারা কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “কমিশন গঠন প্রক্রিয়া ছিল অংশগ্রহণমূলক। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সদস্যরা সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তাই তাদের প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে।”
নতুন নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “সমস্যাগ্রস্ত নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর থেকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ সরাতে হবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে থেকে কাজ করতে হবে।”
এটি স্পষ্ট যে নতুন কমিশনের সামনে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ও কমিশনের দক্ষতার সমন্বয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে বলে দেশের জনগণ আশা করছে।

