২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে গণপিটুনির ঘটনা থামেনি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া কোনো মামলার বিচার এখনো শুরু হয়নি। মানুষ মারা যাচ্ছে, আর পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছে। অথচ আদালতে সাক্ষ্য শুরু হওয়ার মতো অগ্রগতিও চোখে পড়ছে না। মানবাধিকারকর্মীরা সতর্ক করছেন, এই দেরিই নতুন সহিংসতাকে সাহস জোগাচ্ছে।
সরকারি হিসাব আর মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব এক নয়
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মবের ঘটনা ঘটেছে ৬৩টি। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১০৭টি। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ঘটনা কমেছে ৪১ দশমিক ১২ শতাংশ। এই সময়ে নিহত হয়েছেন ৪০ জন এবং আহত ৬৫ জন। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬৩ ও ৮২ জন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো একেবারে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, এই নয় মাসে ১৭১ জন মারা গেছেন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জনের মৃত্যু এবং ৪০১ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। ফলে সরকারি হিসাবের সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যায় ফারাক দাঁড়াচ্ছে ১৩১ থেকে ১৪৭ জনের। আসকের হিসাবে ২০২৪ সালে ১২৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৯৮ জন নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যোগ করলে মোট নিহতের সংখ্যা হয় ৪৯৭ জন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার সজাগ আছে এবং মবের অপসংস্কৃতি শক্তভাবে মোকাবিলা করবে। অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বেসরকারি সংস্থার হতাহতের হিসাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী নুর খান মনে করেন, শুধু ঘটনা কমার সংখ্যা দেখিয়ে সফলতা দাবি করা যায় না। তাঁর কথা, রাষ্ট্র যে মবের বিপক্ষে, তা বিচার করেই মানুষকে বোঝাতে হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, কখনো সন্ত্রাস দমন বা মাদকবিরোধী অভিযানের নামে, কখনো ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে মব ব্যবহার হচ্ছে।
একের পর এক ঘটনা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হননি। ওই মাসের ১৮ তারিখে চুরির সন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল হোসেন নিহত হন। আদালত এই মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করে ২২ আসামির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিলেও তাঁদের সবাইকে আদালতে হাজির করা যায়নি। একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লা নিহত হন, কিন্তু দুই বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
২০২৫ সালের ৯ আগস্ট রংপুরের তারাগঞ্জে চোর সন্দেহে রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে মারা হয়, আর এক বছর পরও সেখানে অভিযোগপত্র হয়নি। ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা হয়, কবর থেকে তুলে তাঁর লাশে আগুন দেওয়া হয় এবং রাসেল মোল্লা নিহত হন। সেই ঘটনায় দুই মামলায় ২৮ জন গ্রেপ্তার হলেও বিচার শুরু হয়নি।
১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, পরে তাঁর লাশ গাছে ঝুলিয়ে পোড়ানো হয়, আর ২৩ জন গ্রেপ্তার হন।
সেদিনই রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়। সেখানে ৩৭ জন গ্রেপ্তার হলেও অনেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন এবং গত ছয় মাসে নতুন কোনো গ্রেপ্তারের খবর নেই।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
তারাগঞ্জের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেখা যায়, ঘটনাস্থলে পুলিশ ছিল, কিন্তু তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে অভিযোগ ওঠে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই উপপরিদর্শকসহ আট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত রুবেল পাইকার গত জানুয়ারিতে জামিনে ছাড়া পান।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, এরপর তিনি তাঁদের হুমকি দিয়েছেন, আর এ নিয়ে পরিবার থানায় জিডি করেছে। তদন্ত কর্মকর্তা ২০ অক্টোবর জানান, ১৯ জন গ্রেপ্তার আছেন এবং শিগগিরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।
দ্য ডেইলি স্টারের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কামাল আহমেদ বলেন, তাঁদের কার্যালয়ে হামলার মামলা সিআইডির কাছে গেছে। গ্রেপ্তার আসামিরা সবাই জামিনে আছেন বলে তাঁর ধারণা, আর পুলিশ এরপর কিছু জানায়নি।
তাঁর মতে, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল ফরেনসিক সক্ষমতা এবং মামলার বিপুল চাপে অনেক মবের বিচার এগোচ্ছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি কামারুম মুনিরা জানান, মামলা করা ও আসামি ধরার নির্দেশ ইউনিটগুলোকে দেওয়া হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া যেতে পারে, আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে মব কমবে।
মবের জন্য নেই আলাদা আইন
বাংলাদেশে মব সহিংসতা বা লিঞ্চিং নিয়ে আলাদা কোনো আইন নেই। এ ধরনের ঘটনার বিচার সাধারণত ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় হয়। অর্থাৎ আইনে মব কী, কে মবের নেতা, আর কে উসকানিদাতা, তার আলাদা সংজ্ঞা নেই। আলাদা শাস্তির বিধানও নেই। ফলে প্রতিটি ঘটনা সাধারণ খুন বা দাঙ্গার মামলার মতো চলে।
এই ফাঁক নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। আলাদা আইনে মব অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট থাকা উচিত, সংগঠক ও উসকানিদাতাদের কঠোর শাস্তি থাকা উচিত, আর গুরুতর ক্ষেত্রে অপরাধ জামিন অযোগ্য হওয়া উচিত। এমন আইন থাকলে তদন্তকারী ও আদালত দুজনেই স্পষ্ট নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারবে।
ভারত-পাকিস্তানে মব লিঞ্চিং বিরোধী পদক্ষেপ
প্রতিবেশী দেশেও এমন উদাহরণ আছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর মণিপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশ লিঞ্চিং প্রতিরোধ বিল পাস করেছে, আর পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে লিঞ্চিং আলাদা অপরাধ। সরকারও বিষয়টি স্বীকার করেছে। ১০ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে বিদ্যমান আইন সংশোধন বা নতুন আইন করা হবে। আমরা এখন পর্যন্ত মবের জন্য পাস হওয়া কোনো আলাদা আইনের খবর পাইনি।
বিদ্যমান আইনে কী আছে
দণ্ডবিধির ১৪১ ধারায় পাঁচ বা তার বেশি মানুষ একই উদ্দেশ্যে জড়ো হলে তা বেআইনি জমায়েত। ১৪৭ ধারায় দাঙ্গার শাস্তি আছে। ১৪৯ ধারা অনুযায়ী, জমায়েতের সাধারণ উদ্দেশ্য পূরণে কেউ অপরাধ করলে দলের প্রত্যেক সদস্য সমান দায়ী হতে পারেন। ৩৪ ধারায় একই অভিপ্রায়ে অপরাধ করা ব্যক্তিরাও সমানভাবে দায়ী।
আর ৩০২ ধারায় খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কবরস্থানে অনধিকার প্রবেশ করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার ধারাও কিছু ঘটনায় প্রযোজ্য হতে পারে, তবে কোন ঘটনায় কোন ধারায় মামলা হয়েছে তা এজাহার ও অভিযোগপত্র দেখে নিশ্চিত হতে হবে।
পুলিশের দায়িত্বও আইনে আছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৭ থেকে ১৩২ ধারায় বেআইনি জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ১৪৯ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধ ঠেকানোর দায়িত্ব পুলিশের।
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রতিটি নাগরিককে আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার দেয়। ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার সুরক্ষিত, আর ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের নিশ্চয়তা আছে। কাগজে এই কাঠামো থাকলেও মাঠে এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আইন কেন থামাতে পারছে না
এ নিয়ে দুই ধরনের মত আছে। একপক্ষ বলছে, মব ঠেকাতে বর্তমান আইন যথেষ্ট নয়, তাই আলাদা আইন দরকার। অন্যপক্ষ বলছে, দেশে যথেষ্ট আইন আছে, সমস্যা প্রয়োগে, কারণ প্রয়োগ অসংগত বা পক্ষপাতদুষ্ট হলে মব সাহস পায়। দুই মতের মাঝখানে একটি বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই। বিচার না হলে অপরাধী ভয় পায় না, আর ভয় না থাকলে ঘটনা বারবার ফিরে আসে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, শুধু নিন্দা জানালে মব থামবে না। তাঁর মতে, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীর আইনি বিচার, ভুক্তভোগীর প্রতিকার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সাধারণ মানুষের জানা দরকার
মবে যোগ দিলে সরাসরি আঘাত না করলেও খুনের মামলার আসামি হওয়ার ঝুঁকি আছে। ১৪৯ ও ৩৪ ধারার কারণে দলের অংশ হিসেবে উপস্থিত থাকাই অনেক সময় যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে ধরা হতে পারে। তাই গুজব শুনে উত্তেজিত হয়ে কোথাও জড়ো হওয়া থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।

