চট্টগ্রামের রাষ্ট্রায়ত্ত চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড—সিইউএফএল—দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকার পর আবার ইউরিয়া সার উৎপাদনে ফিরেছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পর কারখানাটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে যন্ত্রপাতিতে একাধিক কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়। এসব ত্রুটি কাটিয়ে গতকাল সকালে শেষ পর্যন্ত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
সিইউএফএল চালু হওয়ায় কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানাটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, উৎপাদন শুরুর মধ্য দিয়ে তা কিছুটা কমেছে। তবে এবার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কারখানাটি কতটা ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে।
কারখানা সূত্র জানায়, গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার পর প্রথমে ধাপে ধাপে অ্যামোনিয়া উৎপাদন ইউনিট চালু করা হয়। এরপর ইউরিয়া উৎপাদন ইউনিটের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সচল করার কাজ শুরু হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে চালুর সময় কয়েকটি যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচেষ্টায় সেগুলো ঠিক করার পর উৎপাদন শুরু করা হয়।
সিইউএফএলের উৎপাদন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক উত্তম চৌধুরী জানান, গতকাল সকালে প্রাথমিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছে। গত মাসের শেষ দিকে গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলেও কারিগরি সমস্যার কারণে তখনই উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হয়নি। একে একে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সচল করার পর এখন কারখানাটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর কাজ চলছে।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় ছয় মাস পর সিইউএফএল উৎপাদনে ফিরেছে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় যে ক্ষতি হয়েছে, নিয়মিত উৎপাদন চালু রাখা গেলে তা ধীরে ধীরে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
কর্ণফুলী নদীর তীরে আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়া এলাকায় কাফকোর পাশে অবস্থিত সিইউএফএল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা। কৃষি খাতে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে এ কারখানার উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে দীর্ঘদিন কারখানাটি বন্ধ থাকলে দেশে সারের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয় এবং আমদানির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
কারখানাটি পূর্ণমাত্রায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। ফলে গ্যাস সরবরাহে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেও উৎপাদন ব্যাহত হয়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে কিংবা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে পুরো কারখানার কার্যক্রম বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
একসময় সিইউএফএলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল। তবে দীর্ঘদিনের ব্যবহার, পুরোনো যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন ইউনিটের সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং গ্যাসসংকটের কারণে বর্তমানে কার্যকর উৎপাদনক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে।
সর্বশেষ গত ৪ মার্চ গ্যাসসংকটের কারণে সিইউএফএলের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গত মাসের শেষ দিকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পর কারখানা চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার কারণে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সচল করতে বাড়তি সময় প্রয়োজন হয়। এর মধ্যেই কিছু কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় উৎপাদন শুরু আরও পিছিয়ে যায়।
আড়াই বছরে অন্তত ছয়বার বন্ধ
সিইউএফএলের সাম্প্রতিক উৎপাদন ইতিহাসও উদ্বেগের। গত আড়াই বছরে গ্যাসসংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কারখানাটি অন্তত ছয়বার বন্ধ হয়েছে। কখনো কয়েক দিনের জন্য, আবার কখনো কয়েক মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।
কারখানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিইউএফএল মাত্র পাঁচ দিন উৎপাদনে ছিল। এরপর ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পর ওই বছরের অক্টোবরে আবার উৎপাদন শুরু হলেও তা স্থায়ী হয়নি।
পরবর্তী সময়েও গ্যাসের চাপ ও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে একাধিকবার উৎপাদন বন্ধ ও চালু হয়েছে। ফলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কারখানা বারবার চালু করতে গিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের খরচও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গত ৪ মার্চ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকার পর আবার সিইউএফএল চালু হলো।
তবে শুধু কারখানা চালু করাই যথেষ্ট নয়। সিইউএফএলের উৎপাদন টেকসই করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং পুরোনো যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর একটি সার কারখানা পুনরায় চালু করতে গ্যাস পাওয়ার পাশাপাশি অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া ইউনিট, পাইপলাইন, কমপ্রেসরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করতে হয়। এবারও সিইউএফএলকে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
দেশের কৃষি উৎপাদনে ইউরিয়া সারের গুরুত্ব বিবেচনায় সিইউএফএলের ধারাবাহিক উৎপাদন শুধু কারখানাটির জন্য নয়, দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন চালু রাখা গেলে আমদানির ওপর কিছুটা চাপ কমানো এবং স্থানীয়ভাবে সারের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
এখন তাই নজর থাকবে গ্যাস সরবরাহ কতটা স্থিতিশীল থাকে এবং কারখানার পুরোনো যন্ত্রপাতি কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে তার ওপর। বারবার বন্ধের পুরোনো চক্র থেকে বেরিয়ে সিইউএফএল এবার টানা উৎপাদনে থাকতে পারে কি না, সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

