অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এক উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিদেশ যাওয়া আটকাতে উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। সংস্থাটি তাঁর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একইসঙ্গে একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। এই পর্যায়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেলে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁর বিদেশযাত্রা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে যে বিষয়গুলো অনুসন্ধান করা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে বিদেশে অর্থ পাচার, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও বদলি-পদায়নে অর্থের বিনিময়, বিভিন্ন টেন্ডারে কমিশন বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও ব্যক্তিদের নিয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সবচেয়ে বড় অভিযোগটি হলো, প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ পেয়েছে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ চারটি দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—সবচেয়ে বেশি দুবাইয়ে, তারপর সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া এবং সুইজারল্যান্ডে। এই অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল বাড়ি কেনা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি গ্রুপে অর্থ বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার তথ্যও অভিযোগে উঠে এসেছে।
দুদকের এক সহকারী পরিচালক গত রোববার জানান, নতুন করে পাওয়া অভিযোগগুলো আগের অনুসন্ধানের সঙ্গেই সংযুক্ত করা হবে, যাতে পুরো বিষয়টি একসঙ্গে খতিয়ে দেখা যায়।
শুধু পাচার নয়, সরকারি পদে নিয়োগ ও বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এক সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে বড় অঙ্কের অর্থ এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রশাসক পদায়নে কয়েক কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আরেকটি সিটি করপোরেশনের টেন্ডার কার্যক্রম এবং একটি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে থাকার সময় বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। দুটি জেলার সিটি করপোরেশনের টেন্ডারেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে।
গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ সরানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একটি পানি শোধনাগার প্রকল্পের একটি ধাপে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় বৃদ্ধি এবং একটি ক্রীড়া স্থাপনা প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় বাড়িয়ে আত্মসাতের অভিযোগও উঠে এসেছে দুদকের অনুসন্ধানে।
একইসঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের বিনিময়ে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে—একটি পানি সরবরাহ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে, একটি প্রকৌশল সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী পদে এবং একটি সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদাভাবে কোটি টাকার অভিযোগ উঠেছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ঘিরেও নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের একাধিক অভিযোগ পেয়েছে দুদক। উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন, সহকারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং পদোন্নতির পর পছন্দের কর্মস্থলে বদলি—এই তিন ক্ষেত্রেই লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ এসেছে দুদকের অনুসন্ধানে। তাঁর বাবা ও একজন ব্যক্তিগত সহকারীর বিরুদ্ধে ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। আরেকজন ঘনিষ্ঠ সহকারীর বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে মধ্যস্থতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতেই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর সঙ্গে আরও তিনজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। পরে পাওয়া নতুন অভিযোগগুলোও সেই অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ ও দুদকের বক্তব্য মানতে নারাজ আসিফ মাহমুদ নিজে। কিছুদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেছিলেন, অভিযোগগুলোর ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়া গেছে বলে দুদক যে বক্তব্য দিয়েছে, তা প্রত্যাহার করা হোক। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার না হলে আইনি পথে হাঁটার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। এরপর তাঁর পক্ষ থেকে একজন আইনজীবী দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে আইনি নোটিশও পাঠিয়েছেন।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, কোনো তদন্তের চূড়ান্ত ফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই দুদকের বক্তব্যের কারণে তাঁকে নিয়ে গণমাধ্যমে একধরনের বিচার শুরু হয়ে গেছে, যা তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে।
সবমিলিয়ে দুদকের এই উদ্যোগ ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিষয়টি এখন আইনি ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন অনুমোদন পেলে তা অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

