বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস, তেল ও আমদানি করা জ্বালানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা, আমদানি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভর্তুকির চাপ—সব মিলিয়ে এই নির্ভরতা সরকারের জন্য বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের বিকল্প উৎস বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে নতুন করে জোর দিচ্ছে সরকার।
এর অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই তহবিল থেকে বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কম সুদে ঋণ দেওয়া হবে। ঋণের কার্যকর সুদের হার, সব ধরনের ফি মিলিয়ে, সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ রাখা হবে। ঋণ পরিশোধের আগে এক বছর ছাড় পাওয়া যাবে এবং সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সময় থাকবে।
সরকারের এই উদ্যোগ শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনারও একটি প্রচেষ্টা। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানি ও আমদানিনির্ভরতার চাপ কমানোর ক্ষেত্রে এই লক্ষ্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
জ্বালানি অর্থনীতিবিদ শফিকুল আলমের মতে, নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থা থেকে বোঝা যায় যে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনকে ঋণ বিতরণের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে গ্রামের মানুষও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারেন।
বাংলাদেশের মতো দেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা শুধু শহরের বাড়ির ছাদে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ এলাকায় সৌরচালিত সেচপাম্প, বাড়ির সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ছোট প্রকল্পেও এর ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে শিল্পকারখানায় ছাদের ওপর সৌর প্যানেল স্থাপন করে নিজস্ব বিদ্যুতের একটি অংশ উৎপাদন করা গেলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো যেতে পারে।
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকার অর্থায়নের পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা এক আদেশে শিল্পকারখানার ব্যবহারের জন্য আমদানি করা সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর শুল্ক মাত্র ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম কর তুলে নেওয়া হয়েছে।
শিল্পের বাইরে বাণিজ্যিকভাবে আমদানি করা সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রেও প্রায় সব পণ্যে ১ শতাংশ শুল্কের সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে দেশে উৎপাদিত কয়েকটি যন্ত্রাংশ এর বাইরে থাকবে। এসব পণ্যের ওপর আগে আমদানি কর ২৩ শতাংশ থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। ফলে কর ও শুল্ক কমানোর ফলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের প্রাথমিক খরচ কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, বড় আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাড়ির সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংযোগ বাড়াতেও সরকার কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিদ্যুৎ বিনিময়ের ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী গ্রাহকের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার পরিকল্পনা করছে। ফলে একটি পরিবার বা প্রতিষ্ঠান নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে সেখান থেকেও আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
সরকারের এই পদক্ষেপের পেছনে বড় একটি কারণ হলো দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ। গ্যাসের সরবরাহ, জ্বালানি তেলের দাম এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ব্যয়—এসবের যেকোনো একটিতে বড় পরিবর্তন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে সেই চাপ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় এবং সরকারের ভর্তুকির ওপরও পড়ে।
সৌরবিদ্যুৎ সেই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে না পারলেও জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে পারে। সূর্যের আলো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল বা গ্যাস আমদানির প্রয়োজন হয় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব।
তবে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার শুধু ঋণ সস্তা করা বা সরঞ্জামের কর কমানোর ওপর নির্ভর করবে না। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয় এখনো বড় বাধা হতে পারে। একটি পরিবার দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল কমানোর সুযোগ পেলেও শুরুতেই প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে।
এই জায়গায় সরাসরি আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন শফিকুল আলম। তাঁর মতে, দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য মূলধন সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আরও কার্যকরভাবে বাড়ানো সম্ভব। তিনি এ ক্ষেত্রে ভারতের ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন।
নতুন তহবিলের আওতায় ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, বিদ্যুৎ বিনিময় ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত সৌর প্রকল্প, সৌর গৃহব্যবস্থা, শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং সৌরচালিত সেচপাম্পে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত রূপান্তরযন্ত্র, মিটার ও ব্যাটারিও এই অর্থায়নের আওতায় থাকবে।
সব মিলিয়ে, সৌরবিদ্যুতে সরকারের নতুন উদ্যোগকে শুধু পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের কর্মসূচি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকি কমানো, ভর্তুকির চাপ সামলানো এবং ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদার জন্য বিকল্প উৎস তৈরি করার বিষয়।
তবে এই পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সহজ অর্থায়ন বাস্তবে কত মানুষের কাছে পৌঁছায়, সৌর সরঞ্জামের দাম কতটা কমে, বিদ্যুৎ সংযোগ ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয় এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য আলাদা সহায়তা কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর। সরকার যদি এসব বাধা সমাধান করতে পারে, তাহলে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় শুধু একটি বিকল্প উৎস নয়, বরং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

