জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের লংমার্চ ও ধারাবাহিক কর্মসূচির ওপর নজর রাখছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। তবে এসব কর্মসূচিকে এখনই বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মনে করছে না দলটি। পাল্টা কোনো কর্মসূচির কথাও ভাবছে না। বরং কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন দলটির নেতারা।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা প্রথম আলোকে এ কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, সংসদে ও রাজনৈতিক বক্তব্যে তাঁরা বিরোধীদের জবাব দিচ্ছেন। কিন্তু রাজপথে একই ধরনের কর্মসূচি দিয়ে জবাব দেওয়ার প্রয়োজন দেখছেন না।
জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটের সমাধান দাবি করছে বিরোধী জোট। একই সঙ্গে তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কথাও বলছে। এসব দাবিতে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ হয়েছে। আজ শনিবার জোটের লংমার্চ রংপুর অভিমুখে। পরে খুলনা, সিলেটসহ অন্য বিভাগীয় শহরেও একই কর্মসূচির ঘোষণা আছে।
প্রথম দফার পথসভাগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন বিরোধী নেতারা। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেল নেই। তাঁর অভিযোগ, দ্রব্যমূল্য বেড়েছে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। ফেনীর মহিপালের পথসভায় তিনি আরও বলেন, সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, কারও চোখ রাঙানি তাঁরা সহ্য করবেন না। যেখানে বাধা পাবেন, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।
সরকারের দিক থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া এসেছে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকে। সংসদে তিনি বলেন, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার চেষ্টা ছিল কি না। তিনি আরও বলেন, গাড়ির লংমার্চে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা মিটলে তাঁরাই সবার আগে লংমার্চ করতেন।
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সুর তুলনামূলক নরম। তিনি বলেন, বিরোধীদের লংমার্চ গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ। কর্মসূচি পালনের অধিকার সবার আছে। তাঁর ভাষায়, এর বেশি কিছু তাঁরা দেখছেন না।
বিএনপি নেতারা বলছেন, ক্ষমতায় থেকে পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার চেয়ে সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া বেশি জরুরি। সরকার সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। তবে জনদুর্ভোগ তৈরি হলে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে বলেও তাঁরা জানান। আপাতত সরকারি কাজ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্য দিয়েই বিরোধীদের মোকাবিলার কৌশল নিয়েছে দলটি।
জামায়াত এই অবস্থানকে অন্যভাবে দেখছে। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ প্রশ্ন তোলেন, বিরোধীদের কর্মসূচিকে গুরুত্ব না দিলে সংসদে প্রতিক্রিয়া কেন? তাঁর দাবি, সরকারি দলের পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার সক্ষমতা নেই। তাঁর মতে, বিএনপির আগের নৈতিক অবস্থানও আর নেই।
দুই পক্ষের বক্তব্যে একটি অমিল চোখে পড়ে। বিএনপি বলছে, লংমার্চ গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিজে সংসদে তার জবাব দিয়েছেন এবং দল কর্মসূচির ওপর নজরও রাখছে। জামায়াত এই বিষয়টিকেই যুক্তি হিসেবে সামনে আনছে।
বিএনপির ভেতরেও সবাই একমত নন। নেতাদের একটি অংশ মনে করেন, বিরোধীরা জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকলে তা উপেক্ষা করা কঠিন। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের মতো বিষয়ে কর্মসূচি চলতে থাকলে সরকারের ব্যাখ্যা জনগণের কাছে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হতে পারে বলে তাঁদের অভিমত।
দলের কিছু নেতা মনে করেন, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বদলেছে। প্রায় দুই দশক বিরোধী দলে থাকার সময় রাজপথের আন্দোলনই ছিল প্রধান হাতিয়ার। এখন সরকার পরিচালনাই মূল দায়িত্ব। তাই একই ধরনের কর্মসূচিতে নামার তাগিদ কম।
সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়েও আলোচনা আছে। বিরোধী দলগুলো যখন ধারাবাহিক কর্মসূচিতে মাঠে, তখন বিএনপির দলীয় তৎপরতা তুলনামূলক সীমিত। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আলোচনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে দলের বড় কোনো প্রস্তুতি এখনো দৃশ্যমান নয়। কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী নিজেদের উদ্যোগে এলাকায় সক্রিয় আছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে মাঠ গোছানোর কোনো কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশ এখন মন্ত্রিসভা, সংসদ ও প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত।
সব মিলিয়ে দুই পক্ষের কৌশল ভিন্ন। বিরোধী জোট রাজপথে থেকে জনসম্পৃক্ত ইস্যুকে পুঁজি করতে চাইছে। সরকার সমাধানের কাজ ও সংসদের বক্তব্যে জবাব দিতে চাইছে। এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির ওপর। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে মাঠের সাংগঠনিক শক্তিও এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

