বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকারের নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত এখন দেশের খুচরা ব্যবসায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দোকান, বাজার ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশনার কারণে বিশেষ করে ফ্যাশন, জুতা, ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন খুচরা পণ্যের ব্যবসায় বিক্রি কমে গেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, সন্ধ্যার পরই যখন অনেক ক্রেতা কেনাকাটার জন্য বের হন, ঠিক সেই সময় দোকান বন্ধ করতে হওয়ায় তাদের আয় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের কেনাকাটার ক্ষমতা আগে থেকেই কমে গেছে। এর সঙ্গে কেনাকাটার সময় কমে যাওয়ায় ব্যবসার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় আগের মতোই রয়েছে। ফলে বিক্রি কমলেও ব্যবসার স্থায়ী খরচ কমছে না।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সিদ্ধান্তে বদলে গেছে ব্যবসার সময়
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার গত আগস্টে দেশের দোকান, বাজার ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। এর আগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ ছিল।
এর আগে কয়েক দফায় দোকান বন্ধের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে প্রথমে গত এপ্রিল মাসে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ব্যবসায়ীদের আপত্তির পর তা সন্ধ্যা ৭টা করা হয়। ঈদুল আজহার সময় সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে আবার সময় কমিয়ে প্রথমে সন্ধ্যা ৭টা, এরপর ১১ জুন তা বাড়িয়ে রাত ৯টা করা হয়। সর্বশেষ নির্দেশনায় রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে বলা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বারবার সময় পরিবর্তনের কারণে ব্যবসার পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মীদের কাজের সময় নির্ধারণ এবং ক্রেতাদের অভ্যাসের সঙ্গেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সন্ধ্যার পরের বিক্রিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
বাংলাদেশের বাজারে সাধারণত দিনের ব্যস্ততা কমার পর সন্ধ্যার দিকে ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়ে। বিশেষ করে গরমের সময় অনেক মানুষ সূর্য ডোবার পর কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ফ্যাশন ও জীবনধারাভিত্তিক পণ্যের ব্যবসায় এই সময়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড কে ক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান বলেন, গত এক মাসে তাদের বিক্রি কমেছে এবং নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
তার মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কমেছে। এর সঙ্গে দোকান খোলা রাখার সময় কমে যাওয়ায় ফ্যাশন ও জীবনধারার পণ্যের বিক্রি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
তিনি বলেন, ব্যবসার খরচ বাড়লেও আয় কমছে। কিন্তু কর্মীদের বেতন, দোকানভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় আগের মতোই রয়েছে।
বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রিতেও প্রভাব
দেশের বড় জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার জানিয়েছে, তাদের মোট বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশ সাধারণত রাত ৮টার পর হয়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ মোহাম্মদ বলেন, সর্বশেষ দোকান বন্ধের সময় কমানোর পর দেশের বাজারে তাদের বিক্রি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে।
তিনি বলেন, রাত ৮টায় দোকান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ব্যবসার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছে লোটো বাংলাদেশ।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জামিল ইসলাম জানান, নতুন নিয়ম চালুর এক মাসের মধ্যেই তাদের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
তার মতে, তাদের মূল বিক্রির সময় ছিল সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়েই দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে।
ছোট-বড় সব ব্যবসায় চাপ
আন্তর্জাতিক খুচরা প্রতিষ্ঠান মোস্তাফা মার্টও জানিয়েছে, দোকান বন্ধের সময় কমানোর পর তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক বিএম সালেহ মুসা বলেন, সাধারণত ক্রেতারা সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে কেনাকাটা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
তিনি জানান, গত এক মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তাদের আয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।একটি শাখায় যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ টাকা বিক্রি হতো, তা কমে প্রায় ৭০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।অনেক সময় রাত ৮টার পরও ক্রেতারা দোকানে আসেন। কিন্তু নিয়মের কারণে তাদের পণ্য না কিনেই ফিরে যেতে হচ্ছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ডেইলি শপিংও একই সমস্যার কথা জানিয়েছে।
উত্তরার একটি শাখার ব্যবস্থাপক হিরণ মাহমুদ বলেন, এখনো ক্রেতাদের রাত ৮টার মধ্যে কেনাকাটা শেষ করার অভ্যাস তৈরি হয়নি। ফলে বিক্রি ও আয়ের ওপর প্রভাব পড়ছে।ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকসের উত্তরার একটি শাখাতেও বিক্রি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।
শাখাটির অপারেশন প্রধান মো. শরীফ সরকার জানান, দৈনিক গড়ে ৪ লাখ টাকা বিক্রি হলে ১০ শতাংশ কমার অর্থ প্রায় ৪০ হাজার টাকা কম আয়। বর্তমানে তাদের দৈনিক বিক্রি প্রায় ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার মধ্যে রয়েছে।
কমছে আয়, বাড়ছে খরচ
ব্যবসায়ীদের জন্য সমস্যা শুধু দোকান বন্ধের সময় নয়। একই সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।জুতা শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
অ্যাপেক্সের ফিরোজ মোহাম্মদ বলেন, কাঁচামালের বাড়তি খরচের পুরোটা ক্রেতাদের ওপর চাপানো হচ্ছে না। ফলে ব্যবসার লাভের পরিমাণ কমছে।
ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। কারণ বিক্রি কমলেও তাদের নির্দিষ্ট খরচ একই রয়েছে।
বাংলাদেশ ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ও ফাইভ-আর ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাসির খান বলেন, চাহিদা কমে যাওয়া, বাড়তি খরচ এবং জ্বালানি সংকটের কারণে তারা প্রায় ৭০টি বিক্রয়কেন্দ্র স্থায়ীভাবে বন্ধ করেছেন।
তার মতে, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উন্নত না হলে সিদ্ধান্ত বদলাবে না
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দোকান বন্ধের সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক বলেন, এখনো বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং চলছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট।সে সময় সরবরাহ ছিল ১৫ হাজার ৪৩৫ মেগাওয়াট।অর্থাৎ বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৯১৩ মেগাওয়াট।
শীতকালে সাধারণত বিদ্যুতের ব্যবহার কমে যায়। তখন পরিস্থিতির উন্নতি হলে দোকান বন্ধের সময়ের বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ একদিকে যেমন জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয়, অন্যদিকে এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপর।
তাই দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের পাশাপাশি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা যায়।

