ই-কমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসায় গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, অর্ডার নেওয়া ও মজুতের হিসাব রাখার কাজ এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা করতে পারবে। এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন পাঁচ তরুণ উদ্যোক্তা। নাম অমনিস্ট্রা। এখন দুটি প্রতিষ্ঠানে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এখন পর্যন্ত সাড়া ভালো।
অমনিস্ট্রার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আজমল হোসেন জাগো নিউজকে জানান, প্ল্যাটফর্মটি প্রচলিত চ্যাটবটের মতো নয়। সেখানে কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের জন্য আগে থেকে উত্তর ঠিক করা থাকে না। গ্রাহক কী জানতে চাইছেন, তা বুঝে পরিস্থিতি অনুযায়ী উত্তর দেয় এটি। তাঁর ভাষায়, সিস্টেমটি অনেকটা একটি কর্মীবাহিনীর মতো কাজ করে।
কাজের পদ্ধতি সহজ। ব্যবসায়ী প্রথমে পণ্যের তালিকা, বিবরণ, মজুতের পরিমাণ ও বিক্রয়নীতি সিস্টেমে দেবেন। এরপর ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা ওয়েবসাইটে কোনো গ্রাহক যোগাযোগ করলে এআই সেই তথ্য দেখে উত্তর দেবে। পণ্যের দাম, ব্যবহারবিধি বা অন্য তথ্য জানাবে। প্রয়োজনে পণ্যের ছবিও পাঠাবে।
প্ল্যাটফর্মটি বাংলা, ইংরেজি ও বাংলিশে গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলতে পারে। গ্রাহকের আগের কেনাকাটা ও আগ্রহ দেখে পণ্যের পরামর্শও দেয়। এতে একজন ক্রেতার গড় অর্ডারের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব বলে উদ্যোক্তাদের ধারণা।
প্ল্যাটফর্মের অন্যতম সুবিধা মজুত ব্যবস্থাপনা। ব্যবসায়ী কোনো পণ্যের সংখ্যা সিস্টেমে দিয়ে রাখলে বিক্রি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। যেমন ৫০টি পণ্যের মধ্যে ৫টি বিক্রি হলে সিস্টেমে ৪৫টি দেখাবে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এতে মজুত নেই এমন পণ্যের অর্ডার নেওয়ার ঝুঁকি কমবে।
অর্ডারের নাম, ঠিকানা ও অন্য তথ্য কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঠানোর পরিকল্পনাও আছে। এছাড়া গ্রাহকের এলাকার পোস্টকোড এবং বিভিন্ন কুরিয়ারের আগের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত কুরিয়ার বেছে নেওয়ার সুবিধা রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের দাবি, তথ্যের ভিত্তিতে কুরিয়ার বাছাই করলে পণ্য ফেরত আসার হার কমতে পারে। বিক্রি, অর্ডার, গ্রাহক সন্তুষ্টি ও কুরিয়ারের কার্যকারিতাসহ নানা তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে।
পেছনের সফটওয়্যার ব্যবসায়িক গোপনীয়তার কারণে প্রকাশ করেননি উদ্যোক্তারা। তবে জানিয়েছেন, তাঁরা তিনটি প্রতিষ্ঠানের এআই মডেল ব্যবহার করছেন: ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক ও গুগলের জেমিনাই। নতুন সংস্করণ এলে তা যুক্ত করার ব্যবস্থাও আছে। তবে তাঁরা নিজেরা কোনো বড় ভাষা মডেল তৈরি করেছেন, এমন দাবি করেননি। বরং বিদ্যমান মডেলগুলোকে ব্যবসা ব্যবস্থাপনার কাঠামোর সঙ্গে জুড়ে একটি স্বয়ংক্রিয় কর্মীবাহিনী গড়তে চাইছেন।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের সঙ্গে সংযোগের বিষয়ে উদ্যোক্তারা বলছেন, তাঁরা মেটার যাচাইকৃত সেবাদাতা হিসেবে কাজ করছেন। আজমল হোসেনের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নীতিমালা মানা হচ্ছে।
গ্রাহকের চ্যাট বা তথ্য অন্য কোনো ব্র্যান্ডের কাছে বিক্রি বা শেয়ার করা হবে না বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তথ্য আদান-প্রদান ও সংরক্ষণে এনক্রিপশন ব্যবহার হয় এবং প্রতিটি ব্র্যান্ডের তথ্য আলাদা রাখা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান সেবা বন্ধ করলে বা তথ্য মুছতে বললে ৩০ দিনের মধ্যে তা স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হবে। এসবই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দাবি, স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
এখন দুটি প্রতিষ্ঠানে প্ল্যাটফর্মটি চলছে। একটি ফেসবুক ও ওয়েবসাইটে ত্বকের যত্নের পণ্য বিক্রি করে। অন্যটি শিশুদের কাঠের খেলনা, বিপিএফমুক্ত প্লাস্টিকের খেলনা ও প্রাথমিক শেখার সামগ্রী বিক্রি করে।
প্রথম প্রতিষ্ঠানের মালিক ফারহানা নীনা বলেন, আগে গ্রাহকের বার্তা সামলাতে দুজন কর্মী লাগত। কুরিয়ার বাছাই ও অর্ডার পাঠানোর কাজও আলাদাভাবে করতে হতো। এখন এআই ২৪ ঘণ্টা বার্তার উত্তর দিচ্ছে এবং অর্ডার নিশ্চিত করছে। ফলে তিনি নিজে এখন মূলত বিপণনে মনোযোগ দিতে পারছেন। তাঁর দাবি, বিক্রিও বেড়েছে। তবে ব্যবসা নতুন হওয়ায় কত শতাংশ, তা বলতে পারেননি।
দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মো. মোরসালিন জানান, তাঁদের ব্যবসা প্রায় তিন বছরের, তবে অমনিস্ট্রার সঙ্গে কাজ তিন মাসের। আগে মাসে প্রায় এক হাজার গ্রাহক সামলাতে পাঁচজন কর্মী লাগত। এখন গ্রাহকের সব উত্তর দিচ্ছে এআই। তিনজন মিলে অন্য কাজ করছেন, বাকিদের প্রতিষ্ঠানের অন্য বিভাগে কাজে লাগানো হয়েছে। শুরুতে কিছু ভুলত্রুটি হলেও দ্রুত ঠিক করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, বিক্রি কিছুটা বেড়েছে এবং আগে যেসব গ্রাহককে সামলানো কঠিন ছিল, তাঁদের কাছ থেকেও বাড়তি অর্ডার আসছে।
লক্ষ্যণীয়, দুই প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাই ইতিবাচক। তবে দুটিই ছোট ব্যবসা এবং ব্যবহারের সময়ও কম। ফলে বড় পরিসরে একই ফল মিলবে কি না, তা এখনই বলা যায় না।
আজমল হোসেন নিজেই স্বীকার করেছেন, ভাঙা বা অস্পষ্ট বাংলায় লেখা গ্রাহকের বার্তা বুঝতে কখনো কখনো সমস্যা হয়। তাঁর মতে, ত্রুটি ধরা পড়লে দ্রুত সমাধান করা যায় এবং যত বেশি ব্যবহার হবে, সিস্টেম তত নির্ভুল হবে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন বিভাগের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার তাসফিন আলম মনে করেন, ধারণা হিসেবে ই-কমার্সে এআই ব্যবহার খুবই ইতিবাচক। তবে সঠিক উত্তর দিতে হলে পণ্যের তথ্যভান্ডার থেকে তথ্য এনে মেলানোর সক্ষমতা থাকতে হবে। তাঁর ভাষ্য, যেখানে পণ্য ১৫-২০টি, সেখানে এটি তুলনামূলক সহজ। কিন্তু হাজার হাজার পণ্যের বড় মার্কেটপ্লেসে বাস্তবায়ন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। বর্তমানে ই-কমার্সে এআই বেশি ব্যবহার হচ্ছে কনটেন্ট তৈরিতে।
তথ্যপ্রযুক্তি সংগঠন বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, এআই গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণ করে তার আগ্রহ বুঝতে পারে। কোন পণ্যে ক্লিক করছেন, কতক্ষণ দেখছেন বা আবার ফিরছেন কি না, তা দেখে উপযুক্ত পণ্য দেখানো যায়। প্রাথমিক যোগাযোগ ও নিয়মিত প্রশ্নের উত্তরে এআই ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে পারে এবং মানব কর্মীর প্রয়োজন কমাতে পারে। তবে গ্রাহক অনেক সময় এমনভাবে কথা বলেন, যা এআই বুঝতে পারে না। তখন গ্রাহক বিরক্ত হতে পারেন বা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাইতে পারেন। তাঁর আশা, মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে এসব ভুল কমবে।
উদ্যোক্তারা জানান, দ্বিতীয় ধাপে ভয়েস কলভিত্তিক গ্রাহকসেবা চালুর পরিকল্পনা আছে। ব্যাংক ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানের হয়ে এআই ফোনে গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলবে। ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পার্লার, কোচিং সেন্টার ও স্টুডেন্ট কনসালটেন্সির মতো সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য চ্যাট ও কলে সময় নেওয়ার সুবিধাও আসবে। প্রতিষ্ঠানের খোলার সময়, ছুটির দিন ও নোটিশ পিরিয়ড বিবেচনা করে শুধু প্রকৃত ফাঁকা সময় গ্রাহককে দেখানো হবে। বুকিং নিশ্চিত হলে রেফারেন্স নম্বরসহ তা ড্যাশবোর্ডে যুক্ত হবে এবং সেখান থেকেই সময় বদল বা বাতিল করা যাবে।
কোম্পানির নিবন্ধন হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। তার আগেও প্রায় এক বছর ব্যবসায়িক ধারণা ও বাজার নিয়ে গবেষণা করেছেন তাঁরা। আজমল হোসেনের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠাতা স্বপ্নিল রায় যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ টেলিকমে গ্রাহকসেবার কাজ করতেন। সেখান থেকেই এমন প্ল্যাটফর্মের ভাবনা আসে। তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে ভাবনাটি ভাগ করলে সবাই কাজ শুরু করেন।
স্বপ্নিল রায় প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। তিনি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে পড়ছেন। আজমল হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা বিভাগে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আরিনা তাসনিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সামিউল সাকিব ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। টেক লিড আহাদ আবেদীন ফারদিন এই দলের সঙ্গে আছেন।
ব্যবসায়ীরা ২০০ ক্রেডিটের বিনামূল্যের ডেমো ব্যবহার করতে পারবেন। এজন্য অগ্রিম ফি, সেটআপ চার্জ বা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি লাগবে না বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন কার্যক্রম পুরোপুরি অনলাইনে চলছে। ব্যবসা বাড়লে ভবিষ্যতে অফিস নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
দেশের ই-কমার্সের বড় অংশই ফেসবুকভিত্তিক ছোট উদ্যোক্তা, যাঁদের অনেক সময় গ্রাহকের বার্তা সামলাতেই সবচেয়ে বেশি লোকবল লাগে। এই জায়গায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার চাহিদা স্বাভাবিক। তবে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। প্রথমত, বাংলা ও বাংলিশের মতো অগোছালো ভাষায় নির্ভুলতা কতটা টেকসই হবে। দ্বিতীয়ত, বড় পরিসরে পণ্যের সংখ্যা ও গ্রাহক বাড়লে সিস্টেম কেমন সাড়া দেবে। তৃতীয়ত, বিদেশি এআই মডেলের ওপর নির্ভরতা এবং গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার দাবি স্বাধীন যাচাইয়ের অপেক্ষায় আছে। আর কর্মী কমানোর যে উদাহরণ পাওয়া গেছে, তা কর্মসংস্থানের প্রশ্নও সামনে আনে, যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বলছে বাকি কর্মীদের অন্য কাজে লাগানো হয়েছে।

