সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানের আওতায় আছেন আনন্দ শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আবদুল্লাহিল বারী ও তাঁর স্ত্রী আফরোজা বারী। প্রায় এক দশক আগে একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুদক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
দুদক জানিয়েছে, আবদুল্লাহিল বারী, তাঁর স্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে সরকারের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে পাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। আগের অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদনের পরও অভিযোগের কিছু অংশ যাচাই করা বাকি ছিল। সেই অবশিষ্ট অংশ অনুসন্ধানের জন্য কমিশন নতুন একজন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে। তাঁকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
এর আগে ২০১৪ সালের এপ্রিলে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ রপ্তানিকারক এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, নানা অনিয়মের মাধ্যমে ১৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওই সময় দুদক জাহাজ রপ্তানির নামে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিযোগ ছিল, আনন্দ শিপইয়ার্ড বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেনি। যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, সেই কাজেও অর্থ বিনিয়োগ করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যাংকের অর্থ চরমভাবে অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়।
২০১৪ সালের অক্টোবরে অনুসন্ধান আরও গতিশীল করতে দুদক তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী। সদস্য ছিলেন উপসহকারী পরিচালক রাফী মো. নাজমুস সাদাত ও উপসহকারী পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন।
কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণসংক্রান্ত নথিও চাওয়া হয়েছিল। দুদক তখন জানিয়েছিল, নথি হাতে পেলে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কিন্তু পরে সেই অনুসন্ধান আর দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি।
দুদক জানায়, এবারের অনুসন্ধানে আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি আবদুল্লাহিল বারী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্যও যাচাই করা হবে। অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে:
- দেশে থাকা সম্পদ
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন
- বিদেশে অর্থ স্থানান্তর বা সম্পদ গড়ার তথ্য
দুদক সূত্র বলছে, অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবেন। এরপর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কমিশনে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
প্রথমত, এটি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা একটি অভিযোগের নতুন করে পুনরুজ্জীবন। এক দশক আগের অনুসন্ধান কেন থেমে গিয়েছিল, তার ব্যাখ্যা নথিতে নেই। তাই এবার অনুসন্ধান কতটা কার্যকর হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।
দ্বিতীয়ত, অভিযোগের পরিধি বেড়েছে। আগে মূলত ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি সামনে ছিল। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশে অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়। এতে অনুসন্ধান আরও জটিল হবে এবং বিদেশি সম্পদের তথ্য সংগ্রহে সময় লাগতে পারে।
তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতের সংস্কারের প্রেক্ষাপটে এমন পুরোনো ঋণ কেলেঙ্কারির নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ। খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার নিয়ে যখন দেশজুড়ে আলোচনা চলছে, তখন দীর্ঘ পুরোনো অভিযোগ আমলে নেওয়া জবাবদিহির একটি বার্তা দেয়।
চতুর্থত, এবারের অনুসন্ধানের সাফল্য নির্ভর করবে নথির প্রাপ্যতা ও সময়সীমা মানার ওপর। এক দশক আগের ঘটনার নথি সংগ্রহ ও যাচাই সহজ কাজ নয়।
উল্লেখ্য, অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। এটি তথ্য যাচাইয়ের একটি ধাপ। অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে, মামলা হবে কি না। অভিযুক্তদের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। আইনের চোখে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নির্দোষ বলেই বিবেচিত হবেন।

