জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর ঢাকা থেকে খুলনাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসের ভাড়া যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাস মালিকরা। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে সংশ্লিষ্ট রুটের বাস মালিকরা বৈঠক করে এই সিদ্ধান্ত নেন। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এখনো নতুন ভাড়া নির্ধারণ না করায় সরকারি অনুমোদনের আগেই ভাড়া বাড়ানো নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাস কন্ডাক্টরদের বিভিন্ন স্থানে বিরোধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঢাকা থেকে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পিরোজপুর রুটে চলাচলকারী একটি বাস কোম্পানির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘এসব রুটে চলাচলকারী বাস মালিকরা সকালে আলোচনা করে যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যাত্রী যেখানেই নামুন না কেন, বর্তমান ভাড়ার চেয়ে ৫০ টাকা বেশি দিতে হবে।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এখন ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। এর আগে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে দেশে তা পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ালে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাস মালিক জানিয়েছেন, ঢাকার গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া থেকে খুলনা গিয়ে একটি বাস আবার ঢাকায় ফিরতে প্রায় ১৪০ লিটার জ্বালানি তেল লাগে। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ট্রিপে গড়ে ২৮ জন যাত্রী ধরা হয়। জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ সমন্বয়ের জন্যই যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম যে পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, তাতে বিআরটিএ নতুন ভাড়া নির্ধারণ করবে। এ সিদ্ধান্ত নিতে এক-দুই দিন সময় লাগতে পারে। তবে এরই মধ্যে পরিবহন মালিকদের বাড়তি খরচ শুরু হয়ে গেছে। ফলে সরকারি সিদ্ধান্ত আসার আগেই ভাড়া বাড়ানো ছাড়া বিকল্প দেখছি না।’ তিনি আরও বলেন, বিআরটিএ নতুন ভাড়া নির্ধারণ করলে সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি হার অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে ভাড়া ঠিক করা হবে। ‘বিআরটিএ দ্রুত সিদ্ধান্ত দিলে পরিবহন মালিক ও যাত্রী দুই পক্ষের জন্যই ভালো হবে। কারণ সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে সব সময় আগ্রহী হন না। এতে বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ও বাসের কন্ডাক্টরদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিরোধের আশঙ্কা থাকে।’
বাস মালিকদের এই সিদ্ধান্তের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হবে। এর আগে গত এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বিআরটিএ দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়িয়েছিল, যার ফলে ঢাকা-খুলনা রুটে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ৬৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৮০ টাকা হয়েছিল। এরপর আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খরচ বেড়েছে। কিন্তু সরকারি অনুমোদন ছাড়া ভাড়া আদায় করলে যাত্রী-চালক বিরোধের পাশাপাশি আইনগত জটিলতাও তৈরি হতে পারে। বিআরটিএ এখনো নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করেনি, তবে মালিকদের দাবি, দ্রুত এই তালিকা প্রকাশ করা হলে দুই পক্ষের জন্যই স্বস্তি মিলবে।
পরিবহন মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিআরটিএ নতুন ভাড়া নির্ধারণ করলে সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি হার অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় করা হবে। তবে তার আগ পর্যন্ত যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ৫০ টাকা আদায় করা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া ভাড়া বাড়ালে যাত্রীদের প্রতিবাদ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন মালিকদের পরিচালন ব্যয় বাড়লেও তারা বিকল্প খরচ কমাতে পারছেন না। এখন দেখার বিষয়, বিআরটিএ কত দ্রুত নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করে এবং মালিকদের ঘোষিত বাড়তি ভাড়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় কি না।

