সারের আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌদি আরবে যৌথ বিনিয়োগে বড় একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত কারখানাটিতে বছরে ১০ লাখ টন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সাল থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সমান অংশীদারত্বে একটি যৌথ কোম্পানি গঠন করবে। এতে দুই দেশের সরকারের মালিকানা থাকবে ৫০ শতাংশ করে। কারখানায় উৎপাদিত সব সার ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে কেনার নিশ্চয়তা দেবে বাংলাদেশ। অন্যদিকে, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও অন্যান্য কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে সৌদি আরব।
পররাষ্ট্র ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
যেভাবে হবে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ অর্থ দুই দেশের সরকার সমানভাবে বহন করবে। বাকি ৭০ শতাংশ অর্থ সৌদি আরবের আর্থিক খাত থেকে ঋণ হিসেবে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কারখানা নির্মাণে মোট কত টাকা ব্যয় হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কারিগরি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর প্রকল্পের ব্যয়, ঋণের শর্ত এবং বাণিজ্যিক বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে।
প্রস্তাবিত কারখানায় বাংলাদেশের পক্ষে অংশীদারত্বের দায়িত্বে থাকবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেশের আটটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা পরিচালনা করে। যৌথ কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদেও দুই দেশের সমান প্রতিনিধিত্ব রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফরে সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সৌদি আরব সফরকে সামনে রেখে প্রকল্পটি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে এ সফর হতে পারে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। তবে এটি হবে প্রাথমিক ও বাধ্যবাধকতাহীন সমঝোতা। অর্থাৎ, সমঝোতা স্মারক সই হলেই কোনো দেশ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে না।
শিল্পসচিব আবদুন নাসের খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি কাজ করছে।
সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর প্রকল্পটির কারিগরি ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। দুই দেশ সম্মত হলে পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ, অর্থায়ন, কাঁচামাল সরবরাহ এবং সার কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি করা হবে।
সারের চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে নতুন কারখানা
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর কৃষক পর্যায়ে ডিএপি সারের চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএডিসি) জরুরি মজুত হিসেবে আরও ৫ লাখ টন সার সংরক্ষণ করতে হয়। সব মিলিয়ে বছরে মোট চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১৯ থেকে ২০ লাখ টন।
বর্তমানে বেসরকারি খাত প্রায় ৫ লাখ টন ডিএপি সার আমদানি করে। বিসিআইসির দেশীয় উৎপাদনও চাহিদার তুলনায় সীমিত। বাকি প্রয়োজন মেটাতে সরকারি পর্যায়ে চুক্তি এবং উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সার আমদানি করে বিএডিসি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে বিএডিসির প্রতিবছর ৯ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১০ লাখ টন ডিএপি সার আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। সৌদি আরবে প্রস্তাবিত কারখানার উৎপাদনক্ষমতা এই পরিমাণের কাছাকাছি। ফলে কারখানাটি চালু হলে দেশের আমদানির বড় একটি অংশ নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ও প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত দিতে গিয়ে কারখানার পুরো উৎপাদন কেনার নিশ্চয়তা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহের কথা জানিয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আমদানি সম্পর্ক
২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতায় সৌদি আরব থেকে ডিএপি সার আমদানি করছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ দুই বছর মেয়াদি চুক্তিটি সই হয় ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবছর ১৫টি চালানে সার সরবরাহের কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি বাধ্যতামূলক এবং চারটি ঐচ্ছিক। বাধ্যতামূলক চালানের আওতায় বাংলাদেশকে বছরে অন্তত ৪ লাখ ৪০ হাজার টন সার আমদানি করতে হবে।
দেশে ডিএপি সারের আমদানিও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৭২ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৯৯ হাজার টনে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১৬ লাখ ২০ হাজার টন।
নতুন কারখানা চালু হলে বিদ্যমান আমদানি চুক্তি, ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং উৎপাদিত সারের ব্যবহার কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও চূড়ান্ত পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ কমানোর লক্ষ্য
বর্তমানে দেশে প্রতি কেজি ডিএপি সার কৃষকের কাছে ২১ টাকায় বিক্রি করা হয়। আমদানি ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করে।
গত ১৩ অক্টোবর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সৌদি আরব থেকে সরকার-টু-সরকার চুক্তিতে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির অনুমোদন দেয়। প্রতি টনের দাম নির্ধারণ করা হয় ৮৬১ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদেই প্রতি কেজি সারের আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০৬ টাকা।
প্রস্তাবিত যৌথ কারখানার মাধ্যমে তুলনামূলক কম দামে সার সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটি কতটা সাশ্রয়ী হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন ব্যয়, ঋণের সুদ, কাঁচামাল ও পরিবহন খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি সার কেনার নিশ্চয়তার আর্থিক প্রভাবের ওপর।
দেশের একমাত্র ডিএপি কারখানায় উৎপাদন কম
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় ৬৬ একর জমির ওপর ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড। এটিই দেশের একমাত্র ডিএপি সার উৎপাদনকারী কারখানা। এর বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৫ লাখ ২৮ হাজার টন।
তবে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকটে কারখানাটিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিসিআইসির নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ টন। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টন।
চলতি অর্থবছরেও এখন পর্যন্ত কোনো সার উৎপাদন হয়নি। ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে গত ২৮ জুন থেকে কারখানাটি বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন সৌদি কারখানায়ও উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে শিল্পকারখানায় প্রথম সরকারি বিনিয়োগ হতে পারে
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, বিদেশে কোনো শিল্পকারখানায় সরাসরি সরকারি বিনিয়োগের পূর্ববর্তী নজির নেই। সে হিসাবে সৌদি আরবের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি হতে পারে এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ।
তবে বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, অনুমোদন, ঋণের দায় এবং সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকির বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ১০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনসহ প্রযোজ্য বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সার সরবরাহে নতুন একটি দীর্ঘমেয়াদি উৎস তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কারখানার উৎপাদন ব্যয়, অর্থায়নের শর্ত, বাজারমূল্য এবং আর্থিক ঝুঁকি যাচাই করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

