নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য চালু করা বিশেষ বাসসেবা চালাতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়ায় জ্বালানি খরচই উঠছে না, ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।
সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১২ কার্যদিবসে ১৫৮টি ট্রিপে প্রায় ১৪ হাজার টিকিট বিক্রি হয়েছে, যা থেকে আয় হয়েছে মাত্র দুই লাখ টাকার কিছু বেশি। আগের মাস আগস্টের হিসাবেও একই চিত্র—৮ কার্যদিবসে ১১৪টি ট্রিপে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টিকিট বিক্রি হলেও আয় হয়েছিল মাত্র প্রায় এক লাখ টাকা।
বিষয়টি স্পষ্ট করতে মিরপুর থেকে মতিঝিলগামী একটি রুটের হিসাব তুলে ধরা যায়। প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরত্বের এই রুটে যাওয়া-আসা মিলিয়ে একটি বাস প্রতি ট্রিপে ৪২ কিলোমিটার চলে। বর্তমান জ্বালানি মূল্যে হিসাব করলে প্রতি ট্রিপে শুধু ডিজেল বাবদই খরচ হয় প্রায় দুই হাজার টাকার বেশি, সঙ্গে যোগ হয় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। সব মিলিয়ে প্রতিটি ট্রিপেই জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ গড়ে আড়াই হাজার টাকার মতো খরচ পড়ে যাচ্ছে।
এই হিসাব পুরো মাসের সঙ্গে মেলালে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে মোট চলাচলকৃত দূরত্বের জন্য শুধু জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণেই খরচ হয়েছে সাড়ে তিন থেকে চার লাখের বেশি টাকা। অথচ এই সময়ে মোট আয় ছিল মাত্র দুই লাখ টাকার সামান্য বেশি। অর্থাৎ শুধু এই দুই খাতেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়নি চালকের মাসিক বেতন, সহকারীদের পারিশ্রমিক, টায়ার-লুব্রিকেন্ট খরচ, কর ও প্রশাসনিক ব্যয়, যা যোগ করলে প্রকৃত ঘাটতি আরও বাড়বে। আগস্ট মাসের হিসাবেও একই ধরনের বড় ঘাটতির চিত্র মিলেছে।
সেবাটির সীমিত ব্যবহারও একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ৬০ আসনের একটি বাসে প্রতি ট্রিপে গড়ে প্রায় ২০টি আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। এর ফলে সম্ভাব্য আয়ের একটি বড় অংশ প্রতিনিয়ত হাতছাড়া হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিআরটিসির একজন ব্যবস্থাপক গণমাধ্যমকে জানান, নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করাই এই সেবার মূল লক্ষ্য, তাই শুধু আয়-ব্যয়ের নিরিখে একে বিচার করা ঠিক নয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, নিয়মিত ভর্তুকির কারণে করপোরেশনের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তাঁর ভাষ্যে, বাসের সংখ্যা বাড়লে যাত্রীও বাড়বে, আর তাতে ভর্তুকির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসবে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ট্রিপে অন্তত ১২০ জন যাত্রী পাওয়া গেলে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য আসবে, এর বেশি হলে লাভজনক হতে শুরু করবে সেবাটি।
আরেকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—সপ্তাহের সাত দিনই সাধারণ গণপরিবহন এবং বিআরটিসির অন্য বাসগুলো চললেও নারীদের জন্য চালু করা এই বিশেষ সেবা শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকছে। এতে সপ্তাহের দুই দিন সেবাবঞ্চিত থাকছেন নারী যাত্রীরা, আবার সংস্থার সম্ভাব্য আয়ও সীমিত হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপক জানান, শুক্র ও শনিবার কর্মজীবী নারী যাত্রীর সংখ্যা কম থাকায় এই দুই দিন বাস বন্ধ রাখা হচ্ছে।
গত আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ বা পরিচিত নামে ‘পিংক বাস’ নামের এই সেবা চালু হয় দেশের তিনটি বড় শহরে—রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায়। প্রাথমিকভাবে মোট ১৩টি রুটে ১৪টি বাস দিয়ে সেবাটি শুরু হয়েছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস বরাদ্দ রাখা হয়েছে রাজধানীর জন্য।

