দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পরও সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ অঞ্চল। দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চাপ দীর্ঘদিন ধরে বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদায় ময়মনসিংহের অংশ তুলনামূলক কম হলেও লোডশেডিংয়ের বড় অংশের ভার বহন করতে হচ্ছে এই অঞ্চলকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, গ্যাস সরবরাহের সংকট এবং কম খরচের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়া। ফলে প্রয়োজন মেটাতে ব্যয়বহুল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিদ্যুৎ খাতের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই মাস পর ১৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হলেও ওই দিন দেশের মোট লোডশেডিংয়ের ৪৪ শতাংশই হয়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলে।
সর্বোচ্চ চাহিদার সময় রাত ৯টায় ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও শেরপুর—এই ছয় জেলা নিয়ে গঠিত অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতি ছিল ৪৫৫ মেগাওয়াট। একই সময়ে সারা দেশে মোট লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৩২ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ দেশের মোট বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বড় একটি অংশ তখন শুধু ময়মনসিংহ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল।
চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে দেশে যত লোডশেডিং হয়েছে, তার ৩৭ শতাংশ হয়েছে ময়মনসিংহে। একই সময়ে ঢাকায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ১৫ শতাংশ এবং খুলনায় ছিল ১২ শতাংশ।
এখানে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ৯ শতাংশ আসে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের লোডশেডিংয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি চাপ এই অঞ্চলের ওপর পড়ছে।
গ্যাস সংকটেই বড় সমস্যা
ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া। একসময় এই অঞ্চলের তুলনামূলক কম খরচের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়মিত উৎপাদন করলেও বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে সেগুলোর উৎপাদন অনেক কমে গেছে।
রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহারের হার বা প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর ২০২০ অর্থবছরে ছিল ৭০ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ অর্থবছরে তা কমে মাত্র ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বেড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে ইউনাইটেড ময়মনসিংহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর ছিল ৪২ শতাংশ এবং ইউনাইটেড জামালপুরের ছিল ৪৫ শতাংশ।
প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর হলো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্দিষ্ট সময়ে তার মোট উৎপাদন সক্ষমতার কতটা ব্যবহার করতে পারছে, তার পরিমাপক। এই হার যত বেশি হয়, সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্র তত কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে ধরা হয়।
ছয় বছর আগের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২০ অর্থবছরে আরপিসিএলের প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর ছিল ৭০ শতাংশ, যেখানে ইউনাইটেড ময়মনসিংহের ছিল ২৯ শতাংশ এবং ইউনাইটেড জামালপুরের ছিল ৪৩ শতাংশ।
এর মূল কারণ ছিল গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ তুলনামূলক কম হওয়া।
২০২০ অর্থবছরে আরপিসিএল প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে গড়ে ৩ টাকা ৪১ পয়সা খরচে। একই সময়ে ইউনাইটেড ময়মনসিংহে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ ছিল ১১ টাকা ৯৬ পয়সা এবং ইউনাইটেড জামালপুরে ১২ টাকা ২৮ পয়সা।
তবে ২০২৫ অর্থবছরে আরপিসিএলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ টাকা ৫১ পয়সায়। অন্যদিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে খরচ আরও বেশি ছিল। ইউনাইটেড ময়মনসিংহে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ছিল ২৪ টাকা ৯৫ পয়সা এবং ইউনাইটেড জামালপুরে ২৪ টাকা ২ পয়সা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে নির্দিষ্ট ব্যয় একই থাকে। ফলে কম পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর সেই ব্যয় ভাগ হয়ে পড়ে এবং প্রতি ইউনিটের খরচ বেড়ে যায়।
দীর্ঘদিনের সমস্যা
ময়মনসিংহে বিদ্যুৎ সংকট নতুন নয়। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মে থেকে জুলাই মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অঞ্চল নিয়মিতভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি ছিল।
২০২৩ সালের মে থেকে জুলাই সময়ে দেশের মোট লোডশেডিংয়ের ১৮ শতাংশ হয়েছে ময়মনসিংহে, যা দেশের নয়টি বিদ্যুৎ অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল।
২০২৪ সালের একই সময়ে এই অঞ্চলে হয়েছে দেশের মোট লোডশেডিংয়ের ৩২ শতাংশ, যা আবারও সর্বোচ্চ।
গত বছর কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাই সময়ে রংপুরে জাতীয় লোডশেডিংয়ের ৪৪ শতাংশ হলেও ময়মনসিংহ ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে, যেখানে লোডশেডিং ছিল ২০ শতাংশ।
নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পাইপলাইন প্রকল্প
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার ময়মনসিংহ অঞ্চলে নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজীপুরের ধনুয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথক গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে ৩৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি নতুন কম্বাইন্ড-সাইকেল গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড।
তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ অনিশ্চিত হলে প্রকল্পের স্থায়িত্ব ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে প্রয়োজনে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে উচ্চগতির ডিজেল ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোডশেডিং কমাতে সহায়ক হবে।
তিনি জানান, বর্তমান বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার কারণেই একটি আলাদা গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হচ্ছে।
বাড়ানো হচ্ছে সঞ্চালন সক্ষমতাও
শুধু উৎপাদন নয়, ময়মনসিংহে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় কালিয়াকৈর থেকে শম্ভুগঞ্জ পর্যন্ত উচ্চক্ষমতার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি শম্ভুগঞ্জে নতুন একটি উপকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে।
এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ময়মনসিংহে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। গত বছরের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৭৪ শতাংশ।
মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছে। সঞ্চালন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হলে জাতীয় গ্রিড থেকে এই অঞ্চলে আরও বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
ময়মনসিংহের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মূলত উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। নতুন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

