বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের মাধ্যমে। সরকার বলছে, নতুন বাহিনীকে আধুনিক, দক্ষ, পেশাদার এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তবে এই পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, র্যাবকে ঘিরে যে অভিযোগ, বিতর্ক ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তার মূল কারণগুলো কি নতুন কাঠামোর মাধ্যমে দূর করা সম্ভব হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, একটি বাহিনীর নাম, পোশাক বা সাংগঠনিক পরিচয় পরিবর্তন করলেই তার কার্যক্রমের সংস্কৃতি বদলে যায় না। একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিবর্তন নির্ভর করে তার ক্ষমতা ব্যবহারের নিয়ম, তদারকি ব্যবস্থা, স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া এবং অপরাধের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহির ওপর।
র্যাব গঠন করা হয়েছিল বিশেষ ধরনের অপরাধ মোকাবিলা, সন্ত্রাস দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে। ২০০৩ সালে আইনি ভিত্তি তৈরি হওয়ার পর ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ বাহিনীটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এই বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হয়েছিল।
প্রথম দিকে র্যাব সাধারণ মানুষের একটি অংশের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অনেকেই মনে করেছিলেন, প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটি শক্তিশালী বিশেষ বাহিনী গুরুতর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। কিছু এলাকায় অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রে র্যাবের ভূমিকার প্রশংসাও করা হয়েছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাহিনীটির কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে কথিত বন্দুকযুদ্ধ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০০৬ সালের এক প্রতিবেদনে র্যাবের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন, স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য এবং সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তুলে ধরে। তবে সংস্থাটি এটিও উল্লেখ করেছিল যে প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত করা সম্ভব হয়নি এবং অনেক তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদন ও অন্যান্য সূত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
র্যাবকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলা। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন নিখোঁজ হন। পরে তাদের মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আদালত কয়েকজন র্যাব কর্মকর্তাসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করেন। এই মামলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহি নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা সৃষ্টি করে।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও র্যাবের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ দেখা যায়। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর র্যাব এবং কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
র্যাবের অভিজ্ঞতা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সমস্যাটি কি শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি এর পেছনে ছিল প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা?
একটি মত হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের কিছু সদস্যের অপরাধের জন্য পুরো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না। নারায়ণগঞ্জের মামলাতেও আদালত পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে কিছু সদস্যের বেআইনি কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো বাহিনীকে দায়ী করা যায় না।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর যুক্তি ছিল, একটি বাহিনীকে বড় ধরনের ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি যদি কার্যকর নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। তাদের মতে, শুধু ব্যক্তির আচরণ নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষায়িত নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। কারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অপরাধ দমনের জন্য শক্তিশালী ক্ষমতা দিতে হয়, কিন্তু একই সঙ্গে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থাও থাকতে হয়।
এসআরবি গঠনের মাধ্যমে সরকার নতুন একটি কাঠামো তৈরি করেছে। নতুন আইন অনুযায়ী, এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে কাজ করবে। র্যাবের জনবল, সম্পদ, নথি, চুক্তি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকারের দাবি, এসআরবি আগের তুলনায় আরও আধুনিক, পেশাদার এবং জবাবদিহিমূলক হবে। নতুন ব্যবস্থায় অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য একটি কমিটি গঠনের বিষয়ও রাখা হয়েছে, যা নাগরিকদের অভিযোগ এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো দেখবে।
তবে সমালোচকদের মূল প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কতটা গভীর। কারণ র্যাবের অনেক সদস্য ও অবকাঠামো এসআরবিতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। ফলে নতুন বাহিনীকে পুরোনো অভিজ্ঞতা ও কাঠামোর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংস্কার তখনই সম্ভব হবে, যখন কোনো সদস্য বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ও স্বাধীন তদন্ত হবে। অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে যদি একই প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হয়, তাহলে জবাবদিহির প্রশ্ন থেকেই যেতে পারে।
র্যাবের ইতিহাস থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য শুধু ক্ষমতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বচ্ছতা, নজরদারি এবং কার্যকর জবাবদিহি। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে শুধু তার নাম বা কাঠামোর ওপর নয়, বরং জনগণের কাছে তার আচরণ ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
এসআরবির সামনে এখন মূল পরীক্ষা হবে এটি সত্যিকার অর্থে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে কি না। যদি নতুন বাহিনী কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছতা এবং আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এটি একটি বাস্তব সংস্কারের উদাহরণ হতে পারে। আর যদি শুধু সাংগঠনিক পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে।

