দেশের পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে জাতীয় লজিস্টিক নীতি ২০২৫ বাস্তবায়নে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই নীতির বাস্তবায়ন দ্রুত করতে পাঁচটি বিশেষ কর্মদল গঠন করা হয়েছে, যারা লজিস্টিক খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব কর্মদল গঠন করা হয়েছে। জাতীয় লজিস্টিক উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত এই দলগুলোর মূল লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত এবং ব্যয় সাশ্রয়ী করা।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এর অংশ হিসেবে পণ্য পরিবহনের গতি বাড়ানো, ব্যবসায়িক খরচ কমানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ব্যবসার অন্যতম বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বন্দরে পণ্য ছাড়ে দীর্ঘ সময় লাগা, পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, গুদাম সুবিধার ঘাটতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লজিস্টিক খাতে ব্যয় কমানো গেলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একজন বিশেষজ্ঞের মতে, লজিস্টিক ব্যয় মাত্র ১ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে রপ্তানি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
নতুন গঠিত কর্মদলগুলোর একটি কাজ করবে বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে। এই দলের নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্য সচিব। আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে সময়, খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করবে এই দল।
কাস্টমস কার্যক্রম, পণ্য ছাড়, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত বাণিজ্যের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার বিষয়েও কাজ করবে তারা। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হবে।
পণ্য দেশে আসার আগেই তথ্য যাচাই, দ্রুত পণ্য ছাড়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ডের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সুবিধা বাড়ানোর জন্য নতুন কাঠামো তৈরির বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে, লজিস্টিক ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি ডিজিটালাইজেশন কর্মদল গঠন করা হয়েছে।
এই দলের দায়িত্ব হবে পণ্য, কনটেইনার এবং যানবাহনের চলাচল উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত পর্যবেক্ষণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা তৈরি করা। বর্তমানে কাস্টমস, বন্দর, পরিবহন, গুদাম, কর এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আলাদা আলাদা তথ্যপ্রবাহ রয়েছে। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এসব ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে পণ্যের অবস্থান, পরিবহন পরিস্থিতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জাতীয় লজিস্টিক ড্যাশবোর্ড তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও করা হবে।
লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য আলাদা একটি কর্মদলও গঠন করা হয়েছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের একজন নির্বাহী সদস্য এই দলের নেতৃত্ব দেবেন। এই দল দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্র চিহ্নিত করবে এবং বিনিয়োগের পথে থাকা বাধাগুলো বিশ্লেষণ করবে।
বাংলাদেশে বন্দর, গুদাম, পরিবহন অবকাঠামো এবং পণ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব অনেক সময় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। নতুন কর্মদল এসব সমস্যা সমাধানে সুপারিশ দেবে।
লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গঠিত কর্মদলটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করবে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য এই দলের নেতৃত্ব দেবেন।
এই দল দেশের পরিবহন ব্যবস্থা, বন্দর, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো, পণ্য সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং লজিস্টিক হাবগুলোর সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে কোন কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেটিও মূল্যায়ন করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা শুধু পণ্য পরিবহনের বিষয় নয়, এটি একটি দেশের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্রুত ও কম খরচে পণ্য সরবরাহ করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
এ ছাড়া লজিস্টিক খাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্যও একটি কর্মদল কাজ করবে। এই দল খাতটির বর্তমান দক্ষতার ঘাটতি চিহ্নিত করবে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের জনবল প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণ করবে।
বর্তমান সময়ে আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থায় শুধু পরিবহন কর্মী নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, গুদাম পরিচালনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হচ্ছে। তাই দক্ষ জনবল তৈরি এই খাতের উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জাতীয় লজিস্টিক নীতি ২০২৫ গ্রহণের মাধ্যমে সরকার দেশের বাণিজ্য অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রণীত একটি লজিস্টিক নীতি বাতিল করে নতুন নীতি গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তাই কার্যকর লজিস্টিক ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে ব্যবসার খরচ কমবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
তবে শুধু কর্মদল গঠন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। নির্ধারিত পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কতটা সমন্বয় তৈরি হয় এবং বাস্তব সমস্যাগুলো কতটা কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে জাতীয় লজিস্টিক নীতির সফলতা।

