জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া বড় অঙ্কে বাড়ানোর দাবি তুলেছেন লঞ্চ মালিকরা। দূরত্বভেদে প্রতি কিলোমিটারে একান্ন থেকে ষাট শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল সংস্থা। এই দাবি নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার পাঠানো এই চিঠিতে নতুন ভাড়ার কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রথম একশ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য বর্তমানে প্রতি কিলোমিটারে দুই টাকা পঁচানব্বই পয়সা ভাড়া নেওয়া হয়, যা বাড়িয়ে চার টাকা পঁয়তাল্লিশ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একশ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য বর্তমান দুই টাকা বাহান্ন পয়সার পরিবর্তে চার টাকা দুই পয়সা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। এই দাবি পূরণ না হলে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। বিষয়টি নিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রী নিজেই বৃহস্পতিবারের বৈঠকের কথা নিশ্চিত করেছেন।
সংগঠনের সভাপতির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একশ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা বাড়ানো হলে সার্বিক ভাড়া বাড়বে একান্ন শতাংশ, আর তার বেশি দূরত্বে একই হারে বৃদ্ধি হলে ভাড়া বাড়বে ষাট শতাংশ পর্যন্ত। এর পাশাপাশি যাত্রীপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়াও বাত্রিশ টাকা থেকে বাড়িয়ে পঁয়ত্রিশ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়েছে, সোমবার সরকার ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে একশ পনেরো থেকে বাড়িয়ে একশ পঁয়ত্রিশ টাকা করেছে, যার ফলে জ্বালানি ব্যয় প্রায় আঠারো শতাংশ বেড়ে গেছে। যেহেতু অভ্যন্তরীণ নৌপথের লঞ্চগুলো মূলত ডিজেল ও মবিলে চলে, তাই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে পরিচালন ব্যয়ের ওপর।
শুধু জ্বালানি খরচই নয়, আরও বেশ কিছু ব্যয় বৃদ্ধির কথাও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি অনুযায়ী, নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন ফি ও চার্জ ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—কনজারভেন্সি চার্জ ত্রিশ শতাংশ, রুট পারমিট ফি পঞ্চাশ শতাংশ এবং ঘাটে ভেড়ার চার্জ একশ চৌদ্দ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। রুট পারমিটের আবেদন ফরমের ফিও বেড়েছে ষাট শতাংশ।
এ ছাড়া নৌযানের বিশেষ অনুমতি, স্থগিত পারমিট পুনর্বহাল এবং মালিকানা বা নাম পরিবর্তনের জন্যও নতুন ফি ধার্য করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি, জাহাজ জরিপ ও নিবন্ধনের খরচ, আয়কর ও ভ্যাটসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ার কথাও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। এমনকি লঞ্চ মেরামতের বিভিন্ন সরঞ্জাম—যেমন প্লেট, অ্যাঙ্গেল, প্রপেলার, ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ, ওয়েল্ডিং রড, রং ও অন্যান্য স্পেয়ার পার্টসের দাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে পঞ্চাশ থেকে একশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
চিঠিতে ব্যবসায়িক সংকটের একটি দিকও তুলে ধরা হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে অনেক যাত্রী এখন সড়কপথেই যাতায়াত করছেন, ফলে লঞ্চগুলো তাদের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যাত্রী পাচ্ছে না। এতে লঞ্চ মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে দাবি সংগঠনটির। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রস্তাবিত হারে ভাড়া বৃদ্ধির অনুমতি চাওয়া হয়েছে, অথবা বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত ভাড়া কার্যকর হলে বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, তার একটি উদাহরণও দিয়েছে সংগঠনটি—ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে ডেক শ্রেণির ভাড়া বর্তমান চারশ ঊনত্রিশ টাকা থেকে বেড়ে ছয়শ ষাট টাকায় পৌঁছাবে, আর কেবিন শ্রেণির ভাড়া হবে ডেক ভাড়ার প্রায় চার গুণ।

