বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীদের জন্য একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রণয়ন করেছে ‘রোডম্যাপ ফর চাইল্ড কেয়ার ইন বাংলাদেশ’। কর্মজীবী মায়েদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ-সন্তানের যত্ন কে নেবে-সে সমস্যার কার্যকর সমাধানে এই রোডম্যাপ নিয়ে এসেছে নতুন আশা।
রোববার, রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রোডম্যাপটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মমতাজ আহমেদ। অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে ছিলেন মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কেয়া খান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর টুওমো পৌটিআইনেন এবং র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ। রোডম্যাপটি প্রণয়নে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে আইএলও।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মমতাজ আহমেদ বলেন- “শিশুযত্নের বিষয়টি নতুন নয়, তবে বর্তমান সমাজের বাস্তবতায় এ বিষয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এই রোডম্যাপ কেবল উন্নত শিশুযত্ন ব্যবস্থার দিকনির্দেশনাই দিচ্ছে না বরং নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশ ও টিকে থাকার জন্য একটি টেকসই কাঠামো তৈরি করছে। এটি শিশুযত্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করবে।”
রোডম্যাপটি বাংলাদেশে বিদ্যমান শিশুযত্ন সেবার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করেছে এবং তা সমাধানে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দিয়েছে। র্যাপিডের গবেষণার বরাত দিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে সরকারি পরিচালিত ৬৩টি এবং বেসরকারি ১০০টির বেশি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। তবুও ৫৪ শতাংশ নারী শুধুমাত্র সন্তান দেখাশোনার সঠিক সুবিধার অভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারছেন না।
রোডম্যাপটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রার মাধ্যমে শিশুযত্ন ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের ব্যবস্থা এবং এই কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমে সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।
আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর টুওমো পৌটিআইনেন বলেন- “সহজলভ্য, মানসম্পন্ন এবং কম খরচের শিশুযত্ন সেবা নিশ্চিত করা গেলে তা জেন্ডারসমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে মায়েরা কর্মক্ষেত্রে আরও সক্রিয় হতে পারবেন।” তিনি শিশুযত্ন কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর জোর দেন।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও অর্থনৈতিক প্রভাব-
অনুষ্ঠানের আলোচকেরা জানান, রোডম্যাপটি দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে শোভন কাজ ও জেন্ডারসমতা নিশ্চিতের মাধ্যমে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে নারীদের উপর অর্পিত অবৈতনিক কাজের সময় কমিয়ে তাঁদের পেশাগত জীবনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেবে।
রোডম্যাপটি প্রণয়নে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, শ্রমিক-মালিক সংগঠন, চাইল্ড কেয়ার ওয়ার্কার এবং অভিভাবকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এটি বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর পাশাপাশি মানের ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ বলেন- “নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে শিশুযত্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই রোডম্যাপ কেবল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেনি বরং সেগুলো সমাধানে বাস্তবমুখী পরিকল্পনাও দিয়েছে।”
উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা-
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তানিয়া খান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সবুর হোসেন, জাতীয় শ্রমিক শিক্ষা সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান বাদল খান এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল ফারুক আহমেদ। তাঁরা সবাই এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীদের জন্য শিশুযত্ন একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এ রোডম্যাপ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু নারীদের পেশাগত জীবনকে সহজ করবে না বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই উদ্যোগকে কার্যকর করে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

