বিশ্বের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ওয়েব প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে মারাত্মক নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ায় সাইবার হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ভূমিসেবার ওয়েবসাইটসহ বাংলাদেশ ব্যাংক, একাধিক ব্যাংক ও বেসরকারি হাসপাতালের সাইট অচল রয়েছে। সরকারি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত একটি হাসপাতালের ওয়েবসাইট হামলার শিকার হয়েছে।
দেশে প্রতি মাসে প্রায় তিন লাখ মানুষ অনলাইনে জমির নামজারি বা মিউটেশন সেবা নেন। শনিবার এই সেবা নিতে গিয়ে অনেকে দেখেন, ই-নামজারির ওয়েবসাইট বন্ধ। সাইটে দেওয়া বার্তায় বলা হয়েছে, বিজিডি ই-গভ সার্টের জরুরি সাইবার সতর্কবার্তার অংশ হিসেবে ওয়েবসাইট হালনাগাদ করা হচ্ছে, তাই ভূমিসেবা আপাতত বন্ধ। সরকারের সাইবার নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে থাকা এই সংস্থার সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ার পরই এ সতর্কবার্তা জারি করা হয়।
ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক আসিফ মাহমুদ অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সঙ্গে একটি বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। এ কারণে সাইটটি সাময়িকভাবে বন্ধ। রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় ধরা হলেও কাজ আগে শেষ হলে সেবা চালু করে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। তবে ওয়েবসাইটে দেওয়া ঘোষণা ও তাঁর বক্তব্যের মধ্যে কারণ নিয়ে পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশে কতগুলো প্রতিষ্ঠান এই সংকটে পড়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো অস্পষ্ট। কারণ, পিএইচপির ত্রুটির কারণে সাইট বন্ধ রাখার কথা কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রকাশ্যে স্বীকার করছে না। ফলে ক্ষতির প্রকৃত পরিধি জানা যাচ্ছে না।
পিএইচপি আসলে কী? সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অনেকে পিএইচপির নাম না শুনলেও প্রতিদিনই এর সংস্পর্শে আসেন। পিএইচপি হলো ‘হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি এমন একটি প্রোগ্রামিং ভাষা, যা ওয়েবসাইটের নেপথ্যে থেকে কাজ করে। বিবিসির প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট ওয়েবসাইটের প্রায় ৭০ শতাংশ চলে পিএইচপির ওপর ভর করে।
নব্বইয়ের দশকে কানাডার প্রোগ্রামার রাসমাস লারডর্ফ এটি তৈরি করেন। তিনি এর সোর্স কোড সবার জন্য উন্মুক্ত রাখেন। ফলে যে কেউ বিনা খরচে এটি ব্যবহার করতে পারেন এবং নিজের প্রয়োজনমতো বদলে নিতে পারেন। এ কারণেই এটি এত ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বিবিসি বিষয়টি বোঝাতে রেস্তোরাঁর উদাহরণ দিয়েছে। আপনি রেস্তোরাঁয় বার্গার অর্ডার করলে পরিবেশক সেই অর্ডার রান্নাঘরে পৌঁছে দেন, রান্না শেষে খাবার আপনার টেবিলে আসে। ওয়েবসাইটেও একই প্রক্রিয়া চলে। আপনি কোনো পাতায় ঢুকলে পিএইচপি আপনার চাহিদা বুঝে পাতাটি তৈরি করে সামনে হাজির করে। পুরো কাজ হয় নিমেষে, ব্যবহারকারী টেরও পান না।
এক দশক ধরে লুকিয়ে ছিল ত্রুটি: পিএইচপির এই দুর্বলতা এক দশকের বেশি সময় ধরে ছিল, অথচ এত দিন কারও নজরে আসেনি। গত সপ্তাহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এটি শনাক্ত করেন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের একদল গবেষক। প্রতিষ্ঠান দুটি ক্যালিফ ও উইজ। উইজ গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের একটি কোম্পানি।
ক্যালিফের গবেষক রায়ান অস্টিন এই শনাক্তকরণে যুক্ত ছিলেন। বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর এ পর্যন্ত শনাক্ত করা ত্রুটিগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুতর। ত্রুটির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হ্যাকাররা এর সুযোগ নিয়ে ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও তথ্য চুরির চেষ্টা শুরু করে। তখনই বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়ায় এবং একের পর এক সাইট বন্ধ হতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) ২১ অক্টোবর পিএইচপি ব্যবহারকারী সব প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে। সংস্থাটির পরামর্শ ছিল, দ্রুত ত্রুটি সারাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা বন্ধ রাখা উচিত। কারণ, এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সরাসরি তথ্যভান্ডারে হামলা চালানো সম্ভব।
সতর্কতার পর গেমিং প্ল্যাটফর্ম, সরকারি ওয়েবসাইট ও অনলাইন ফোরামসহ নানা সেবা ব্যাহত হয়। উইকিপিডিয়া পরিচালনাকারী যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান উইকিমিডিয়া সতর্কতা হিসেবে বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাজ্য সরকার বৃহস্পতিবার জানায়, তাদের কিছু সীমিত সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকতে পারে। এর অংশ হিসেবে ৩২টি ওয়েবসাইট বন্ধ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জ ত্রুটি সারানোর কাজ চলার কারণে বিশ্বজুড়ে কিছু নির্দিষ্ট সেবায় প্রবেশ বন্ধ রাখে। ফিনল্যান্ড সরকার কিছু ওয়েবসাইট ও পাতা বন্ধ করেছে। বিবিসির কয়েকটি পাতাও সাময়িকভাবে নামানো হয়। নেদারল্যান্ডসের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাও নিজেদের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখে।
এর মধ্যেই ভারতে বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের খবর এসেছে। ‘সিরিউসিম’ নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠী দাবি করে, তারা দেশটির প্রধান ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গ্রাহকদের গোপন তথ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। শুক্রবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি গ্রাহকদের তথ্য ফাঁসের কথা স্বীকারও করেছে।
বিশ্বজুড়ে শত শত ওয়েবসাইট বন্ধ হলেও এতে আর্থিক ক্ষতি কত হয়েছে, তা কেউ জানায়নি। মোট কতগুলো সাইট বন্ধ হয়েছে, সে হিসাবও প্রকাশ করা হয়নি। তবে নিরাপত্তা বাড়ানোর উপায় জানিয়ে বলা হয়েছে, পিএইচপি হালনাগাদ করলে ঝুঁকি কমে আসবে।
বিজিডি ই-গভ সার্ট পিএইচপি নিয়ে জরুরি সতর্কবার্তা দেয় ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। বার্তায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের সার্ভারে পিএইচপির ব্যবহার শনাক্ত করতে, ব্যবহৃত সংস্করণ ঝুঁকিপূর্ণ কি না তা যাচাই করতে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
এরপর বৃহস্পতিবার থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পদক্ষেপের পর আরও কয়েকটি ব্যাংকও সতর্কতামূলকভাবে নিজেদের সাইট বন্ধ করে। এগুলো হলো অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক। ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি এড়ানো এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য এ সিদ্ধান্ত। যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা শেষ হলে সাইটগুলো আবার চালু হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সতর্কতার অংশ হিসেবেই ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন, যাতে কোনো সমস্যা না হয়। তিনি দাবি করেন, এতে ব্যাংকিং সেবায় কোনো প্রভাব পড়েনি। ঝুঁকি কমলে ওয়েবসাইট খুলে দেওয়া হবে।
বিজিডি ই-গভ সার্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের একটি বেসরকারি হাসপাতালের ওয়েবসাইট আক্রান্ত হয়েছে বলে শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলেও শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা সার্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। পিএইচপি-সংশ্লিষ্ট অন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ওয়েবসাইটে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে।
সার্টের প্রকল্প পরিচালক নাজমুল হক খন্দকার জানান, পরামর্শবার্তা দেওয়ার পর জাতীয় ডেটা সেন্টারে হোস্ট করা ওয়েবসাইট এবং ন্যাশনাল পোর্টাল ফ্রেমওয়ার্কের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো বা সিআইআই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সতর্ক করা হয়েছে। যাদের ওয়েবসাইট পিএইচপি দিয়ে তৈরি, তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তথ্য ফাঁসের পুরোনো ক্ষত, তাই বাড়ছে উদ্বেগ। বাংলাদেশে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) গত আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের।
এর মধ্যে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডার থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালেও পাঁচ কোটি মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁস হয়েছিল। এসব ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন ত্রুটি দেশের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বিষয়টিকে ‘অবশ্যই উদ্বেগজনক’ বলে মনে করেন। তাঁর প্রশ্ন, কেউ যদি ভূমিসেবার সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভূমি রেকর্ড বদলে দেয়, কিংবা আয়কর সাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানকার তথ্য মুছে ফেলে, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্বজুড়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কী পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তা নজরে রেখে দেশেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূমি রেকর্ড, কর ব্যবস্থা ও ব্যাংকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের ডিজিটাল সেবা এখন সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। এসব সেবার ওয়েবসাইট বা সার্ভার দখলে গেলে তার প্রভাব শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, নাগরিক অধিকার ও আর্থিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি ওয়েবসাইট বন্ধের কারণ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্পষ্ট অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও ধোঁয়াশাপূর্ণ করেছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান কতটা ঝুঁকিতে আছে, তা স্পষ্ট না হলে সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। এ অবস্থায় স্বচ্ছতা, দ্রুত সংস্কার ও নিয়মিত নিরাপত্তা হালনাগাদকেই সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিএইচপি হালনাগাদ করলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে বলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ রয়েছে। তাই ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত নিজেদের সার্ভারে ব্যবহৃত সংস্করণ যাচাই করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে বলা হয়েছে।

