চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় দেশের দীর্ঘতম সরকারি কেব্ল কারটি গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ পড়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হওয়া এই স্থাপনাটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ এখনো শুরু হয়নি, অর্থ বরাদ্দও মেলেনি বন বিভাগের পক্ষ থেকে।
শেখ রাসেল এভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্কের প্রধান আকর্ষণ ছিল এই কেব্ল কারটি, যা নির্মাণে খরচ হয়েছিল প্রায় সাড়ে সতেরো কোটি টাকা। সম্প্রতি সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, দুটি স্টেশনের অবস্থাই এখন বিপর্যস্ত। প্রথম স্টেশনের টিকিট কাউন্টার, অভ্যর্থনাকক্ষ, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, শৌচাগার ও জেনারেটর কক্ষ সবকিছুই ভাঙা। সেখানে পড়ে আছে সাতটি কেবিন, যেগুলোর কাচ চূর্ণবিচূর্ণ এবং ভেতরের অধিকাংশ যন্ত্রাংশ খোয়া গেছে। প্রায় আড়াই কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে দ্বিতীয় স্টেশনে গিয়েও একই দৃশ্য চোখে পড়ে—আরও পাঁচটি কেবিন নষ্ট অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
পার্কের কর্মীদের বরাতে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে টানা তিন দিন ধরে এই ভাঙচুর ও লুটপাট চলে। ভারী যন্ত্রপাতি ও কেবিনগুলো ওজনের কারণে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সেগুলো ভেঙে ফেলে রাখা হয়, আর তুলনামূলক হালকা যন্ত্রাংশ ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কেব্ল কারের পথ কোথাও কোথাও ভূমি থেকে প্রায় একশ ফুট উঁচু দিয়ে চলত, যেখান থেকে পাহাড়, বনভূমি ও জলাধারের দৃশ্য উপভোগ করা যেত। তুলনায়, দেশের প্রথম সরকারি কেব্ল কার বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সের যাওয়া-আসার পথ মাত্র ৪৮৮ মিটার—রাঙ্গুনিয়ার এই স্থাপনাটি তার প্রায় পাঁচ গুণ দীর্ঘ।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন দায়িত্বশীল বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মেরামত কাজ ব্যয়বহুল হওয়ায় এতে দেরি হচ্ছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য বিদেশ থেকে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ দল আনার প্রয়োজন, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশও আমদানি করতে হবে। তবে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো ঝুলে আছে।
ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ প্রতিবেদন অনুসারে, প্রথম বা নিচের স্টেশন ও নিয়ন্ত্রণকক্ষে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার, আর দ্বিতীয় বা উপরের স্টেশনে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ কেব্ল কার সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতেই মোট ক্ষতি প্রায় তিন কোটি টাকা। পুরো পার্কের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে পাঁচ কোটি সাড়ে ষোলো লাখ টাকার বেশি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চট্টগ্রাম নগরী থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের পাশে প্রায় ৫২০ একর এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা এই পার্কটির প্রথম পর্যায়ের নির্মাণে খরচ হয়েছিল প্রায় চল্লিশ কোটি টাকা, যা ২০১৩ সালের নভেম্বরে উদ্বোধন করা হয়। কেব্ল কারটি নির্মিত হয় এর দুই বছর পর, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে, যা স্থাপন করেছিল কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় কারিগরি কর্মীরা তাদের কাছ থেকেই পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেন। সর্বোচ্চ বিশটি কেবিন চালানোর সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে বারোটি কেবিন দিয়ে এটি পরিচালিত হতো, প্রতিটিতে ছয়জন যাত্রীর ধারণক্ষমতা ছিল।
তবে কেব্ল কারটির ইতিহাস শুরু থেকেই বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। উদ্বোধনের মাত্র দুই মাসের মধ্যে দ্বিতীয় স্টেশনের একটি পিলারের ভিত্তি থেকে মাটি সরে যাওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তার কারণে এটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। প্রায় সোয়া কোটি টাকা খরচ করে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের পর ফের চালু হয় এটি। এরপর ২০২১ সালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আবারও বন্ধ হয়ে যায়, প্রায় দুই বছর পর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মেরামত করে চালু করা হয়। মাত্র এগারো মাস পরিচালিত হওয়ার পরই ২০২৪ সালের ভাঙচুরে তা একেবারে অচল হয়ে পড়ে।
কেব্ল কারটি সচল থাকাকালে দিনে গড়ে চারশ থেকে সাতশ দর্শনার্থী এতে চড়তেন, উৎসব ও ছুটির দিনে সেই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেত। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যাওয়া-আসার টিকিটের দাম ছিল দুইশ ত্রিশ টাকা, শিশুদের জন্য একশ পনেরো টাকা।
২০১৮ সালে পার্কটি সম্প্রসারণের জন্য প্রায় একশ পঁচিশ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি থেকে অনুমোদন পায়, যেখানে কেব্ল কারের পথ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও ছিল। তবে পরে সেই পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়।
স্থানীয় সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, অতীতে পার্কের কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও এখন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পার্ক আধুনিকায়ন এবং কেব্ল কার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মতে, কেব্ল কার চালু থাকলে দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, আর এটি বন্ধ থাকায় পার্কের সামগ্রিক আকর্ষণও কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আশ্বাস নয়—সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাজেট বরাদ্দ ছাড়া এই ব্যয়বহুল স্থাপনাটি পুনরুদ্ধার বাস্তবে সম্ভব নয়। দুই বছরের বেশি সময় অচল থাকায় যন্ত্রাংশের আরও ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে মেরামত ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

