জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা বা লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক পদে তার যুক্ত হওয়ার খবর প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদটির দায়িত্ব-পরিধি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। একশ নব্বইটি সদস্য দেশের গোপন ভোটে নিরানব্বইটি ভোট পেয়ে তিনি এক বছরের জন্য এই দায়িত্ব পান এবং গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শপথ নেন। এর আগে ঊনিশশ ছিয়াশি সালে একচল্লিশতম অধিবেশনে বাংলাদেশের এক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। খলিলুর রহমানের কার্যালয়ের অধীনেই এখন লিগ্যাল অফিসার হিসেবে কাজ করবেন জাইমা রহমান।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সভাপতির কার্যালয়ের লিগ্যাল অফিসার প্রতিষ্ঠানের মূল বা কেন্দ্রীয় আইন বিভাগের কর্মকর্তা নন—তিনি বরং সরাসরি সাধারণ পরিষদের সভাপতির ব্যক্তিগত আইনি পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকদের মতে, এই কর্মকর্তার মূল কাজ হলো সাধারণ পরিষদে কোনো প্রস্তাব বা রেজুলেশন কীভাবে উত্থাপিত হবে, কোনো সদস্য রাষ্ট্র পদ্ধতিগত আপত্তি তুললে সভাপতি কী সিদ্ধান্ত দেবেন, বা কোনো সংশোধনী আন্তর্জাতিক আইনসম্মত কি না—এসব বিষয়ে সভাপতিকে পরামর্শ দেওয়া।
বিশেষ করে স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বিতর্কের সময় সভাপতি যাতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারেন এবং তার কোনো সিদ্ধান্ত পক্ষপাতমূলক বলে বিবেচিত না হয়, সে জন্য জাতিসংঘ সনদ ও অতীতের বিভিন্ন নজির বিশ্লেষণ করে সভাপতির জন্য আইনি সুরক্ষা তৈরি করাও এই পদের দায়িত্বের অংশ।
এর পাশাপাশি কোনো প্রস্তাব প্রচলিত বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, বা বাজেট-সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাবে সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন কি না, তা যাচাই করাও লিগ্যাল অফিসারের কাজ। জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগ ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং সভাপতির আন্তর্জাতিক আইনি বক্তব্যের খসড়া তৈরিতেও তিনি সহায়তা করেন। সংক্ষেপে বলা যায়, সভাপতির প্রতিটি কার্যক্রম জাতিসংঘের আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতির মধ্যে থাকছে কি না, তা নিশ্চিত করাই এই পদের মূল উদ্দেশ্য।
জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, একাশিতম অধিবেশনের সভাপতির দপ্তরে ঊনত্রিশটি দেশের ছয়টি ভাষার মোট চল্লিশজন কর্মকর্তা কাজ করছেন, যাদের মধ্যে জাইমা রহমানসহ ছয়জন বাংলাদেশি রয়েছেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত জানান, সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে জাতিসংঘের নিজস্ব স্থায়ী কর্মীদের পাশাপাশি সভাপতি তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে অতিরিক্ত লোকবলও যুক্ত করতে পারেন, এবং সাধারণত আন্তর্জাতিক আইনে অভিজ্ঞ বা কোনো দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের এ পদে নিয়োগের রীতি দীর্ঘদিনের।
সভাপতির কার্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানকে একজন ব্যারিস্টার এবং আইন-নীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও রাজনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যারিস্টার সনদ লাভ করেন এবং বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত আইনজীবী হিসেবেও কাজ করছেন। যুক্তরাজ্যে আবাসন, জনকল্যাণ ও শ্রম আইন এবং স্বাস্থ্য খাতে আইনি পরামর্শ ও জনসংযোগের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার, পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণ আইনে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে। সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক জননীতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তির অধিকার এবং শিক্ষা-লিঙ্গসমতা বিষয়ে কাজ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার পরিচিতিতে।
এই নিয়োগ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেন, এই পদে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতা তার রয়েছে, এবং সভাপতির আইনি সহায়তা দলে কাজের এই সুযোগ আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক আইন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে তার জন্য।

