পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়; এটি নিরাপত্তা, রাজনীতি, ভূমির অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্র–নাগরিক সম্পর্কের সম্মিলিত সংকট। তাই কেবল অভিযান দিয়ে স্থায়ী শান্তি আসবে না।
প্রেক্ষাপট
সশস্ত্র সংঘাতের খবর এলেই আলোচনা নিরাপত্তা জোরদার, অভিযান ও আইনশৃঙ্খলায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিনের শান্তির প্রতিশ্রুতির পরও অস্থিরতা ফিরে আসা, নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের ভয় ও অনিশ্চয়তা না কাটা এবং শান্তিচুক্তির পর রাজনৈতিক সমাধান প্রত্যাশিত মাত্রায় না এগোনোর প্রশ্নগুলো এড়ানো যায় না।
সাম্প্রতিক উদ্বেগের উদাহরণ:
• ২০২৪ সালে থানচিতে ব্যাংক লুট, থানায় হামলা ও অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা।
• সাম্প্রতিক সময়ে সাজেককে ঘিরে অবরোধ ও গোলাগুলির খবর।
এসব ঘটনা দেখায়, সমস্যাটিকে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না।
শান্তিচুক্তি: স্বাক্ষর হয়েছে, বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ
১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ও রাজনৈতিক সমাধানের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিক জীবন ফেরা, ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হওয়া এবং জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আস্থা বাড়া।
কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষর আর বাস্তবায়ন এক নয়। দীর্ঘদিন ধরে যেসব বিষয় অমীমাংসিত:
• ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি
• স্থানীয় সরকার ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা
• প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন
• রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব
• প্রশাসনিক ক্ষমতা
এই দীর্ঘসূত্রতা প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি করে। কোনো জনগোষ্ঠী যখন মনে করে অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা নেই বা ন্যায়সংগত সমাধানের পথ বন্ধ, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা দুর্বল হয়। সেই শূন্যতায় রাজনৈতিক চরমপন্থা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দুটি অবস্থান স্পষ্ট থাকা দরকার:
• বঞ্চনার অভিযোগ সশস্ত্র হামলা, অপহরণ, চাঁদাবাজি বা নিরীহ মানুষের ওপর সহিংসতাকে বৈধতা দেয় না।
• সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপরাধের দায় পুরো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো অন্যায়। দায় ব্যক্তি ও সংগঠনের, কোনো জাতিসত্তার নয়।
নিরাপত্তা ও আস্থা: অস্ত্রের ভয় এবং আস্থাহীনতা, দুটিই বাস্তব
অবৈধ অস্ত্র, সশস্ত্র তৎপরতা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা সাধারণ মানুষের জীবন অনিরাপদ করে। মানুষ স্বাধীনভাবে চলতে না পারলে, ব্যবসায়ীকে চাঁদার ভয়ে কাজ করতে হলে বা পর্যটককে ভ্রমণ বাতিল করতে হলে ক্ষতি আইনশৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনেও পড়ে।
*রাষ্ট্রের স্পষ্ট দায়িত্ব*:
• মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
• অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা
• সীমান্তপথে অস্ত্র ও অপরাধী নেটওয়ার্কের চলাচল প্রতিরোধ করা
তবে নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা, নির্বিচার হয়রানি বা অভিযোগের প্রতিকার না দেওয়া আস্থার সংকট আরও গভীর করতে পারে। তাই অভিযান হতে হবে লক্ষ্যনির্দিষ্ট, আইনসম্মত ও জবাবদিহিমূলক, এবং নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অস্ত্র ও অভিযানে নয়; ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ও নাগরিকের আস্থা অর্জনের সক্ষমতাতেও।
ভূমি বিরোধ ও উন্নয়ন: সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তি অসম্ভব
পাহাড়ে ভূমি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি বসতি, জীবিকা, সংস্কৃতি, পরিচয় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। মালিকানা, দখল, অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়ায়।
সড়ক, পর্যটনকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক প্রকল্প প্রয়োজনীয়। কিন্তু তিনটি প্রশ্নের জবাবও চাই:
• উন্নয়নের সুফল কারা পাচ্ছে?
• কারা জমি হারাচ্ছে?
• স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
উন্নয়ন যদি কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি বাড়ায়, তবে তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা জরুরি।
শান্তির অন্যতম শর্ত তাই ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা, বিরোধ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা এবং ভূমিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বিরোধ অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রেখে কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তরুণদের সামনে বিকল্প
কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের হতাশ করে, আর সেই হতাশা সশস্ত্র বা অপরাধী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে। তাই তরুণদের শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না; তাদের সম্ভাবনাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:
• মানসম্মত শিক্ষা, স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রেখে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো
• কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন
• প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান
• ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন
• রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বাস্তব ক্ষেত্র তৈরি
• পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণদের মধ্যে শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে যোগাযোগ বৃদ্ধি
সহযোগিতার বাস্তব ক্ষেত্র তৈরি না হলে সম্প্রীতির আহ্বান কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বিদেশি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা
ভৌগোলিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও প্রতিবেশী অঞ্চলের অস্থিরতা নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে; প্রয়োজন গোয়েন্দা সমন্বয়, সীমান্ত নজরদারি ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ।
তবে প্রমাণ ছাড়া প্রতিটি অস্থিরতাকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল বললে প্রকৃত সমস্যা আড়ালে পড়ে। ভূমি বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি, স্থানীয় ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার মতো অভ্যন্তরীণ কারণেরও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন দরকার।
আবার বহিঃস্থ ঝুঁকি সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়। সিদ্ধান্ত হতে হবে অনুমানে নয়, গোয়েন্দা তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে।
করণীয়: ছয় দফা কর্মপরিকল্পনা
বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের বদলে একটি সময়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক কর্মপরিকল্পনা জরুরি।
- শান্তিচুক্তির অগ্রগতি প্রতিবেদন: কোন বিষয় বাস্তবায়িত, কোনটি বাকি এবং কোথায় আটকে আছে, তা প্রকাশ্যে জানাতে হবে। প্রতিটি অমীমাংসিত বিষয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা ও বাস্তবায়ন সূচক নির্ধারণ করতে হবে।
- ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি: ভূমি কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানো, নথি যাচাইয়ের স্বচ্ছ পদ্ধতি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
- সশস্ত্র অপরাধের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা: আটক, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং নিরপরাধ ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
- নিয়মিত সংলাপ: পাহাড়ি ও বাঙালি প্রতিনিধিদের নিয়ে, যেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নারী, তরুণ, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজ থাকবে।
- উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় অধিকার: স্থানীয় মানুষের অধিকার ও স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও পর্যটনের আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
- নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ: সংঘাতের সময় গুজব, জাতিগত বিদ্বেষ ও উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে। তাই দ্রুত তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ দরকার।
পাহাড়কে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে
পাহাড়ের শান্তি কোনো একক জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্থানীয় প্রশাসন, পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং নাগরিক সমাজ, সবারই ভূমিকা আছে; তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বড়।
শান্তি মানে শুধু গোলাগুলি বন্ধ হওয়া নয়। এর অর্থ:
• মানুষের নিরাপদে চলাচলের অধিকার
• ভূমি নিয়ে বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি
• ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের আশাবাদ
• সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ
• পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিকের বৈষম্য বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হওয়া
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই আর কত অভিযান চালানো হবে, তা নয়; বরং সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। শান্তি ফিরবে তখনই, যখন অস্ত্রের ভয় কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। সেই আস্থার পথ হলো ন্যায়, অধিকার, জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।

