অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রচারণার প্রতিশ্রুতি এবং ২৮ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের একটি শাড়ি নেওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ এখন আদালতের এজলাসে গড়িয়েছে। ফ্যাশন পেজ ‘অ্যাপোনিয়া’র দায়ের করা প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীনের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানজিন তিশা।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক এবং আইনি শুনানি শেষে আদালত বিবাদীর জামিন বর্ধিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। গত বছরের নভেম্বরে দায়ের হওয়া এই মামলাটি কেবল একজন তারকার আইনি জটিলতাই প্রকাশ করছে না, বরং দেশের উদীয়মান ই-কমার্স ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং খাতের আইনি ও বাণিজ্যিক অস্পষ্টতাকেও দৃশ্যমান করছে।
আদালতের প্রশাসনিক কক্ষ ও প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই এই মামলাকে কেন্দ্র করে আইনি তৎপরতা চোখে পড়ে। নির্ধারিত অভিযোগ গঠন বা চার্জ শুনানির দিনে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খোরশেদ আলমের সঙ্গে আদালতে উপস্থিত হন তানজিন তিশা। শুনানির সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী অভিযোগ তোলেন যে, পূর্ববর্তী জামিন পাওয়ার পর আসামি নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ থেকে বাদী ও আইনজীবীদের নিয়ে নানা বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে জামিনের শর্ত লঙ্ঘন করেছেন।
বিপরীতে বিবাদীপক্ষের কৌঁসুলি মামলা থেকে অব্যাহতি বা ডিসচার্জের আবেদনের যুক্তি তুলে ধরে সময় প্রার্থনা করেন। আদালত দুই পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে মামলাটি পরবর্তী শুনানির জন্য নথিভুক্ত রাখেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের মেয়াদ বহাল রাখার আদেশ প্রদান করেন।
বিরোধের মূল সূত্রপাত ঘটে ২০২৫ সালের শেষ দিকে, যখন অনলাইনভিত্তিক বুটিক শপ ‘অ্যাপোনিয়া’র প্রশাসক আমিনুল ইসলাম আদালতের দ্বারস্থ হন। এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ফ্যাশন পেজ থেকে একটি মূল্যবান শাড়ি নেওয়ার পর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং বিনিময়ে পণ্যের সঠিক মূল্য পরিশোধ করার চুক্তি করা হয়েছিল। তবে পণ্য হাতে পাওয়ার পর যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতে আদালত সমন জারি করেন। অন্যদিকে অভিনেত্রী তানজিন তিশা শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে আসছেন যে শাড়িটি তাঁকে কোনো প্রমোশনাল চুক্তির আওতায় নয়, বরং বাণিজ্যিক উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।
তারকা বিপণন বা ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো লিখিত চুক্তি না থাকা এবং ‘উপহার’ ও ‘বাণিজ্যিক প্রচারণার’ মধ্যে স্পষ্ট রূপরেখা না থাকার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রায়ই এ ধরনের আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হন।
আদালতের বিচারিক কার্যক্রম শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিনেত্রী তানজিন তিশা তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেন যে মামলার পে পেছনে একটি বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট কাজ করছে এবং তাঁর তারকামূল্যের সুযোগ নিয়ে একটি বিশেষ পক্ষ অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে দর্শকদের ভালোবাসাই তাঁর মূল শক্তি এবং আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা অনুচিত। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত পরিচিতি বা তারকা খ্যাতি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ সুবিধা তৈরি করে না; বরঞ্চ চুক্তিভঙ্গ ও প্রতারণার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই বিচার সম্পন্ন হয়।
কয়েক হাজার টাকার একটি পণ্যের লেনদেন কেন্দ্র করে এই আইনি লড়াই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স ও বুটিক শিল্পের জন্য একটি নীতিগত বার্তা বহন করে। দেশে বর্তমানে ডিজিটাল কমার্স পরিচালনায় লিখিত চুক্তি বা শর্তাবলীর আইনি বাধ্যবাধকতার চর্চা অত্যন্ত দুর্বল, যার সুযোগ নেন অনেক আমদানিকারক ও প্রচারক।
এই ধরনের মামলা প্রমাণ করে যে পণ্যের পরিমাণ ছোট হলেও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে যেকোনো পক্ষ দণ্ডবিধির আওতায় আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পরিশেষে, তারকা ও বাণিজ্যিক পেজগুলোর মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব কেবল ব্যক্তিগত মতবিরোধের বিষয় নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতির সুস্থ বিকাশ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি সতর্কতামূলক শিক্ষা হিসেবে থাকবে।

