রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র (এমসিএইচ-এফপি সেন্টার) গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা মিললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ইসিবি চত্বরের জমি দখল ও গোলাগুলির ঘটনায় সরকার বা পুলিশের কোনো ব্যর্থতা নেই বলেও দাবি করেছেন তিনি।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দুর্গাপূজাসংক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
রাড্ডার ঘটনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, সেখানে নির্মোহ তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রীর ভাষ্য, যাঁরা অপরাধী হিসেবে ঘটনাস্থলে ছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু সেটি বিবেচনায় নেওয়া হবে না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
মিরপুরের ইসিবি চত্বর এলাকার জমি দখল ও গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এজাহার পাওয়ার পর আইনি নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করে মামলা নথিভুক্ত করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, এখানে প্রভাব খাটানোর কিছু নেই। দুর্বৃত্ত কারা, তা সবাই দেখেছে। জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে রাতের অন্ধকারে। ৯৯৯-এ ফোন করার পর পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গেছে, গ্রেপ্তার করেছে এবং কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে। গোলাগুলির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত চলছে এবং মামলাও হয়েছে।
এই ঘটনায় সরকারের সমালোচনা করা কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের প্রসঙ্গও তোলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সালমান মুক্তাদির সমালোচনা করে বলেছেন, মামলা হয়নি। কিন্তু আইন অনুযায়ী এজাহার পেলেই সঙ্গে সঙ্গে মামলা লেখা যায় না। আগে পুলিশকে প্রাথমিক তদন্ত করতে হয়। না হলে যে কাউকে, এমনকি মন্ত্রী ও সাংবাদিককেও আসামি করে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কেউ যদি বঙ্গভবনের জমি নিয়েও আপত্তি তোলে, সেটিও এজাহার হয়ে যাবে। তাই যাচাইয়ের পর মামলা এন্ট্রি করতে হয়।
মন্ত্রী আরও জানান, সালমান মুক্তাদির নিজে এখন পর্যন্ত মামলা করেননি। যিনি মামলা করেছেন, তিনি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে করেছেন। সরকার ও বিএনপির বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা এবং বিএনপিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে চাঁদাবাজ বলার বিচার জনগণই করবে। তাঁর দাবি, এই ঘটনায় কোনো চাঁদাবাজি হয়নি। সালমান মুক্তাদির নিজেই বলেছেন, তাঁর কাছে চাঁদা চাওয়া হয়নি। মন্ত্রী এ ধরনের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান।
তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, সে নিউ গিনি প্রপার্টিজ হোক কিংবা পাশের জমির মালিক, সবাইকে তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। খুব দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, অপরাধীকে কেবল অপরাধী হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ৯৯৯-এ ফোন করলেই পুলিশ যাচ্ছে, গ্রেপ্তার করছে এবং মামলা নিচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, যেখানে ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বা পুলিশ ব্যর্থ হয়, সেখানে সরকারের দায় থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকার বা পুলিশের কোনো ব্যর্থতা নেই। তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছু প্রকাশ না করা হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সরকার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক-দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।
বুধবার সকালে মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষের প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মন্ত্রী জানান, উচ্ছেদ অভিযানের দায়িত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে সঠিকভাবে যোগাযোগ করেননি। এটিকে তিনি মূলত সমন্বয়ের অভাব বলে চিহ্নিত করেন। মন্ত্রী আরও বলেন, এ বছর ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রশংসনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে।
এই বক্তব্যের কয়েকটি দিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, তদন্তের আওতায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম আসা গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকলে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হয়, সেটিই জনআস্থার মূল মাপকাঠি। শুধু তদন্ত চলছে বলাই যথেষ্ট নয়। কত দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ হবে, তা জানানো জরুরি।
দ্বিতীয়ত, এজাহারের পর প্রাথমিক যাচাইয়ের যুক্তি আইনি দিক থেকে ব্যাখ্যাযোগ্য। তবে ভুক্তভোগীর দৃষ্টিতে মামলা নথিভুক্তিতে বিলম্ব মানেই ন্যায়বিচারে দেরি। এতে প্রভাবশালীদের পক্ষে সময়ক্ষেপণের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। যাচাইয়ের সময়সীমা স্পষ্ট থাকা দরকার।
তৃতীয়ত, ‘পুলিশ বা সরকারের কোনো ব্যর্থতা নেই’, এই দাবি বিতর্কের জায়গা রাখে। একই ঘটনায় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য মন্ত্রী নিজেই দিয়েছেন। সেই ব্যবস্থার কারণ কী, তা প্রকাশ না হলে দুটি বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বোঝা কঠিন।
চতুর্থত, ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশংসা ইতিবাচক হলেও তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুরো চিত্র নয়। দখল, ভাঙচুর ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার মতো ঘটনা নাগরিকের নিরাপত্তাবোধে প্রভাব ফেলে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এগুলোকে ছোট করে দেখলে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
পঞ্চমত, মিরপুরের হকার সংঘর্ষের ক্ষেত্রে মন্ত্রী সমন্বয়ের ঘাটতির কথা বলেছেন। এটি প্রশাসনিক স্বীকারোক্তি হিসেবেও দেখা যায়। ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের মধ্যে যোগাযোগের এই ফাঁক কীভাবে তৈরি হলো, তা খতিয়ে দেখা এবং ভবিষ্যতে উচ্ছেদ অভিযানে সমন্বয়ের স্পষ্ট নিয়ম করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আইন প্রয়োগের অঙ্গীকার করেছেন। এখন দেখার বিষয়, সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবে রূপ পায়। তদন্তের ফল প্রকাশ ও দায়ীদের বিচারের মধ্য দিয়েই প্রমাণ হবে, কথার সঙ্গে কাজের মিল কতটা।

