প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি গুপ্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা এখন সরকারকে নসিহত করছেন, অথচ তাঁদের কিছু সদস্য নারীদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত। আজ বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ফেনীর পরশুরামে মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করেই এ মন্তব্য করেছেন।
উন্নয়ন প্রকল্পের অনুষ্ঠানে দেওয়া এই রাজনৈতিক বক্তব্য ক্ষমতাসীন দল ও জামায়াতের মধ্যকার টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত নয় এবং জামায়াতের পক্ষ থেকে এর কোনো প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি গুপ্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা আমাদের নসিহত করছে। তাদের বলব, আগে নিজের ঘরের দিকে নজর দিন।’ তাঁর ভাষ্য, ওই দলের কিছু সদস্য নারীদের ওপর নির্যাতন করছেন এবং এ নিয়ে তদন্ত চলছে, তাই এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। তবে এর পরপরই তিনি বলেন, মানুষ বলে, তাঁদের এক নেতা শুধু নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হননি, একজন মানুষের জীবনাবসান ঘটিয়েছেন।
এখানে একটি স্ববিরোধিতা লক্ষ করার মতো। তদন্ত চলছে বলে মন্তব্য না করার কথা বললেও তিনি প্রকাশ্য সমাবেশে এমন গুরুতর ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওই নেতার নাম বা ঘটনার বিবরণ তিনি দেননি এবং সেটি ‘মানুষ বলে’ বলে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ নিজের দাবি হিসেবে নয়। চলমান তদন্তের বিষয়ে সরকারপ্রধানের এমন প্রকাশ্য মন্তব্য তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কোন তদন্ত, কোন সংস্থা করছে এবং কোন ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, তা প্রতিবেদনে নেই। ফলে এই অভিযোগ কতটা যাচাইযোগ্য, তা বলা কঠিন।
জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মানুষকে বিভ্রান্ত করে দলটি কিছু আসনে জিতেছে এবং এরপর ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ করছে। তাঁর অভিযোগ, দলটি দেশে অরাজকতা তৈরির চক্রান্ত করছে। একাত্তরে তাদের ভূমিকা কী ছিল এবং কীভাবে মা-বোনদের নির্যাতন করেছে, তা সবাই জানে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তারা এখন আবার অরাজকতা ও নারী নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে।
নির্বাচনে জয়কে ‘বিভ্রান্ত করে’ পাওয়া বলায় নির্বাচনের ফল ও ভোটারদের রায় নিয়েও একটি পরোক্ষ মন্তব্য এসেছে, যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ বা ব্যাখ্যা তিনি দেননি। ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান অভিযোগকে এক সূত্রে গাঁথাও রাজনৈতিক বক্তৃতার একটি পরিচিত কৌশল। তবে বর্তমান ঘটনার অভিযোগ আদালত বা তদন্ত সংস্থার সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রমাণিত নয়, আর অতীতের অভিযোগের সঙ্গে তা মেলানোর ভিত্তিও বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়নি।
ফেনীর রাজনৈতিক ইতিহাস স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেলায় শত শত নেতা-কর্মী ১৭ বছর ধরে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর মতে, এখন সময় এসেছে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার এবং ‘অরাজকতাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের’ জবাব দেওয়ার। এই জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, রাজনৈতিকভাবে নাকি আইনি পথে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতার কাছ থেকে ‘জবাব দেওয়া’র আহ্বান রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। তাই এর ব্যাখ্যা ও ব্যাপ্তি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সংযম প্রয়োজন।
উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, মুহুরী ও কহুয়া নদী পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। দুই-আড়াই বছর আগে এই এলাকায় বড় বন্যা হয়েছিল, যখন ঘাটঘর মুহুরী ব্রিজের ওপর দিয়ে পানি বয়ে গিয়েছিল। এমন বন্যা ঠেকাতেই এই উদ্যোগ এবং এটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর হিসাবে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকার প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষকেরা সেচ সুবিধা পাবেন এবং ফসলের উৎপাদন প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন বাড়বে।
উৎপাদন বাড়লে কৃষকের লাভ হবে এবং দেশে দাম কম রেখে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা যাবে বলেও তিনি মনে করেন। ২০২৪ সালের বন্যায় ফেনী ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, তাই এই প্রকল্প স্থানীয়দের জন্য বাস্তব প্রয়োজনের জায়গা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পের ব্যয়, সময়সীমা ও কাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা প্রতিবেদনে নেই। এসব তথ্য ছাড়া প্রকল্পের কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নের গতি মূল্যায়ন করা কঠিন।
প্রধানমন্ত্রী খাল ও নদী খনন কর্মসূচিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শুরু করা উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, বিএনপি জনগণের জন্য রাজনীতি করে বলেই এই কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পকে দলীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার এই চেষ্টা সমাবেশের রাজনৈতিক সুরেরই অংশ।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের হিসাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকার কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। এতে সরকারের ১৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে এবং সারা দেশে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন। এই হিসাবে একটি অসংগতি আছে। প্রত্যেক কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা মওকুফ হলে ১৩ লাখ কৃষকের জন্য সর্বোচ্চ ব্যয় হওয়ার কথা প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা ১৫ হাজার কোটি টাকার চেয়ে অনেক কম। হয় উপকারভোগীর সংখ্যা আরও বেশি, নয়তো ব্যয়ের অঙ্ক অন্য কিছু ধরে হিসাব করা হয়েছে, কিংবা প্রতিবেদনে সংখ্যা উদ্ধৃতিতে ভুল হয়ে থাকতে পারে। সরকারি সূত্র থেকে সঠিক তথ্য নিশ্চিত হওয়া দরকার।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সারা দেশে গ্রামগঞ্জ ও শহরের প্রতিটি পরিবারের মায়েদের কাছে সরকার ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চায় এবং আজ ফেনীতেই এই কর্মসূচি চালু হবে। তিনি মা-বোনদের হাতে কার্ড তুলে দেবেন। তাঁর ভাষ্য, খেটে খাওয়া পরিবারের মায়েদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলাই এর উদ্দেশ্য। একইভাবে কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। তবে কার্ডের মাধ্যমে কী সুবিধা মিলবে, কারা যোগ্য হবেন, কতজন পাবেন, কত টাকা ব্যয় হবে এবং কৃষি কার্ড কবে থেকে চালু হবে, বক্তব্যে এসব বলা হয়নি। এ ধরনের কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করে উপকারভোগী নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিতরণের কার্যকারিতার ওপর। তাই এসব তথ্য প্রকাশ হওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্য খাতে প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল ৫০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যায় রূপান্তর করবে, যাতে স্থানীয় মানুষ চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস এবং শিশু ও মাতৃসেবা সহজে পেতে পারেন। শয্যা তিন গুণ করলে ভবন, চিকিৎসক, নার্স ও যন্ত্রপাতির বড় ঘাটতি পূরণ করতে হবে, যার ব্যয় ও পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস ও মাতৃসেবার সুযোগ বাড়ানো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য তা বড় স্বস্তির কারণ হবে, তবে সময়সীমা পাঁচ বছর এবং এর বাস্তবায়নই মূল পরীক্ষা।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, স্থানীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম মজনু এবং পরশুরাম উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল হালিম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেলা দুইটায় ফেনীতে পৌঁছান এবং আড়াইটায় প্রকল্প উদ্বোধন করেন। সমাবেশস্থল আগেই কানায় কানায় ভরে উঠেছিল। সমাবেশে লোকসমাগমের সঠিক সংখ্যা বা আয়োজনের ব্যয় নিয়ে কোনো তথ্য নেই।
সব মিলিয়ে সমাবেশের বক্তব্যে দুটি ধারা স্পষ্ট। একদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড ও হাসপাতাল সম্প্রসারণের মতো উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে জামায়াতের বিরুদ্ধে কড়া রাজনৈতিক আক্রমণ। এখন নজর থাকবে জামায়াত এই অভিযোগের কী জবাব দেয়, নারী নির্যাতনের যে তদন্তের কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তার অগ্রগতি কী এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের বিস্তারিত কাঠামো কবে প্রকাশ হয়, সেদিকে। নির্বাচনের সাত মাস পর রাজনৈতিক বক্তব্যের এই তীব্রতা প্রধান দুই পক্ষের সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিও দেখার বিষয়।

