প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠের এক জনসভায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, তাঁর কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে যে দুই পক্ষ এক হয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই মন্তব্যের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গোয়েন্দা সংস্থাকে কি আবারও আগের মতো রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। জামায়াত ও এনসিপির নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। বিএনপি নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী জেনেবুঝেই কথাটি বলেছেন।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিকেলে রাজশাহীর জনসভায় তিনি বলেন, সরকারের কাছে গোয়েন্দাদের খবর আছে। তাঁর ভাষ্য, দেশের কয়েকটি জায়গায় কিছু কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে যে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। এরপর তিনি দুই পক্ষকে ইঙ্গিত করে বলেন, একজন সীমান্তের ওপার থেকে পয়সা দিচ্ছে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
বিএনপি নেতারা এই বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দলটির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স বিবিসি বাংলাকে বলেন, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের যোগসাজশের কথা তাঁরা আগেও বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান থেকে তাঁর কাছে এ ধরনের তথ্য আছে বলেই তিনি বলেছেন, কারণ প্রধানমন্ত্রী না জেনে কথা বলবেন না। তাঁর যুক্তি, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একসঙ্গে এরশাদ সরকারকে বৈধতা দিয়েছিল এবং ১৯৯৬ সালেও দুই দল একসঙ্গে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। ফলে বিএনপির ভেতরে এই ধারণা আছে যে জামায়াত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আবারও বিএনপির বিরুদ্ধে এক হতে পারে।
বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, শুধু বক্তব্য নয়, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে ব্যবস্থাও নেওয়া উচিত। দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী ওপার থেকে আওয়ামী লীগ টাকা পাঠাচ্ছে এবং এপারে জামায়াতের কেউ না কেউ তা গ্রহণ করছে। তাঁর মতে, এখন তাঁদের আইনের আওতায় আনা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব।
জামায়াতে ইসলামী প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মঙ্গলবারই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন উপেক্ষা করে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে আওয়ামী লীগের ফেরার পথ করে দিচ্ছে। রাতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে অভিযোগ করেন, জনদুর্ভোগ নিরসন ও অপকর্ম দমনের বদলে বিএনপি সরকার বিরোধী দলের চরিত্র হননে ব্যস্ত।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিবিসি বাংলাকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও আওয়ামী লীগ গুলশানের মতো জায়গায় মিছিল করছে এবং নানা তৎপরতা চালাচ্ছে, অথচ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এ নিয়ে কোনো তথ্য নেই। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকে এমন বক্তব্য দেওয়ায় তাঁরা হতাশ। তাঁর অভিযোগ, অতীতে আওয়ামী লীগ যেভাবে নিজেদের ব্যর্থতার দায় বিরোধীদের ওপর চাপাত, বিএনপিও একইভাবে তাদের ব্যর্থতার দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপাচ্ছে।
এনসিপির নেতাদের কেউ কেউও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। দলটির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তোলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী কি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে বিরোধী দলের ওপর গোয়েন্দাগিরির ঘোষণা প্রকাশ্যে দিতে পারেন।
বিবিসি বাংলা কয়েকজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলেছে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করা একজন কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মূল দায়িত্ব জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরের (এনএসআই)। কিন্তু সংস্থাটি সেভাবে শক্তিশালী ছিল না, তাই বিভিন্ন সময়ে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর মতে, সরকার গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করতে পারে, তবে তা হতে হবে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে। একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, অতীতের সব সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনায় গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করেছে, তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কারণে কখনো কখনো বিতর্কও হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর বলেন, সরকার চাইলে প্রয়োজনে গোয়েন্দা সংস্থা বা তাদের তথ্য ব্যবহার করতে পারে। আসল প্রশ্ন হলো, সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে কি না, যা নির্ভর করে সরকারের ওপর। তিনি আরও বলেন, জনসমক্ষে সরকারপ্রধান কোনো তথ্য দিতে গিয়ে সূত্র প্রকাশ করে ফেললে পরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কাজ করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়।
পরিস্থিতিটি দুটি প্রশ্নকে সামনে এনেছে। প্রথমত, গোয়েন্দা তথ্য সাধারণত গোপনে সরকারের নীতি ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত হয়; সেটি জনসভায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে উল্লেখ করা হলে সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দ্বিতীয়ত, প্রকাশ্যে বলা এই অভিযোগের প্রমাণ বা ভিত্তি কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সরকার ও বিএনপির দাবি, তথ্যটি দায়িত্বশীলভাবেই দেওয়া হয়েছে; বিরোধী দলের দাবি, এটি ব্যর্থতা ঢাকার কৌশল। অভিযোগ প্রমাণে আইনি পদক্ষেপ আসে কি না এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কতটা পেশাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে, তা নিয়ে বিতর্ক সামনের দিনগুলোতেও চলতে পারে।

