ঢাকার ফুটপাতের সংকট শুধুই দখল বা উচ্ছেদের প্রশ্ন নয়; এটি একটি বড় নগর ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন। একদিকে একজন পথচারীর যেমন নিরাপদ ও বাধাহীনভাবে হাঁটার অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, হাজার হাজার নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ফুটপাতই হয়ে উঠেছে জীবিকার শেষ আশ্রয়। তাই, সমস্যার মূল কারণ শুধু ফুটপাত দখলকারী মানুষ নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা। যেখানে এত বিপুল মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি?
মিরপুর-১০ নম্বর হোপ মার্কেট এলাকায় সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান আবারও এই পুরোনো বিতর্ক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযানের পর এলাকার ফুটপাত ও সড়ক অনেকটাই খালি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন- কারণ দীর্ঘদিন দখলে থাকা ফুটপাতে হাঁটা, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে উচ্ছেদ হওয়া ব্যবসায়ীদের জীবিকার প্রশ্নও উদ্বেগজনক প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ ফুটপাতের দোকান অবৈধ স্থাপনা হলেও, এটি অনেক পরিবারের একমাত্র দৈনন্দিন আয়ের উৎস।
ঢাকায় কত মানুষ ফুটপাত ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল?
বাংলাদেশে ফুটপাত বা রাস্তার পাশের ব্যবসার কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই। যে কারণে সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরে আনুমানিক ২ থেকে ৩ লাখ মানুষ ফুটপাত ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। BRAC Institute of Governance and Development (BIGD)-এর গবেষণায় ঢাকায় প্রায় ৩ লাখ স্ট্রিট ভেন্ডরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় হকারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার, ঈদের মতো বিশেষ সময়ে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
অর্থাৎ, শুধু একজন ফুটপাত ব্যবসায়ী নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের জীবন ও জীবিকা। যদি একজন বিক্রেতার আয়ের ওপর গড়ে ৩–৪ জন পরিবারের সদস্য নির্ভর করেন, তাহলে ঢাকায় কয়েক লাখ ফুটপাত ব্যবসায়ীদের মোট পরিবারের সদস্যসংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি, যাদের জীবনযাত্রা কোনো না কোনোভাবে এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এটি একটি আনুমানিক হিসাব; কারণ এ বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ নেই।
ফুটপাতের ক্রেতা কারা?
ফুটপাত বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু বিক্রেতাদের জায়গা নয়, এটি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের একটি বড় ক্রয়ব্যবস্থা।
ঢাকার বহু মানুষ কম দামে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, খাবার ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য কিনতে ফুটপাতের বাজারের ওপর নির্ভর করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময়ে রাজধানীর ফুটপাত বাজারগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষ কম দামের পণ্য কিনতে ভিড় জমায়, কারণ শপিং মল বা বড় মার্কেটের তুলনায় এখানে দাম অনেক কম থাকে।
একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার স্ট্রিট ভেন্ডরদের সেবা শহরের বড় অংশের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; গবেষণায় বলা হয়েছে, শহরের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এসব বিক্রেতার সেবা ব্যবহার করেন।
অর্থাৎ ফুটপাত অর্থনীতি শুধু দরিদ্র বিক্রেতাদের বিষয় নয়; এটি ঢাকার নিম্ন আয়ের ক্রেতাদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা। এখন প্রশ্ন হলো, এই বাজার উচ্ছেদ হলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত নাগরিকেরা কোথায় যাবেন পণ্য ক্রয় করতে? তাহলে কী তাদের জন্য রাষ্ট্র বিকল্প কিছু ভাবছে? এর উত্তরটাও খুবই প্রায়োজন।
তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যার বীজ বপন হয়- যখন ফুটপাতের মতো জনসাধারণের জায়গা রাজনৈতিক ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া দখল হয়ে যায়। ফুটপাতের মূল উদ্দেশ্য হলো পথচারীদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু ঢাকার অনেক এলাকায় বছরের পর বছর ধরে দোকান, অস্থায়ী স্থাপনা, গাড়ি পার্কিংসহ নানা ধরনের দখলের কারণে ফুটপাতের প্রকৃত ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে হাঁটেন, যা যানজট, দুর্ঘটনা এবং সামগ্রিক নগর বিশৃঙ্খলা আরও বাড়িয়ে তোলে।
মিরপুর-১০ নম্বর হোপ মার্কেট এলাকার পরিস্থিতিও এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। উচ্ছেদের পর স্থানীয় অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন পর তারা ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ পাচ্ছেন। অর্থাৎ ফুটপাত দখলমুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য দখলের পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কিন্তু শুধু উচ্ছেদ কি সমাধান?
অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু উচ্ছেদ করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা কঠিন। কারণ সমস্যার মূল কারণ হলো, একদিকে শহরের সীমিত জায়গা, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার প্রয়োজন।
ঢাকার মতো শহরে নিম্ন দক্ষতার মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। অনেক মানুষ গ্রাম থেকে শহরে এসে আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে ছোট ব্যবসায় যুক্ত হন। গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, দারিদ্র্য, গ্রাম-শহর অভিবাসন, কম শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতা অনেক মানুষকে ফুটপাত ব্যবসায় নিয়ে আসে।
তাই একজন হকারকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ তার জায়গায় আবার অন্য কেউ আসতে পারে, যদি একই সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বিদ্যমান থাকে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, নগরবাসীর চলাচলের সুবিধার জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং পুনরায় দখল ঠেকাতে মনিটরিং টিম কাজ করবে। তিনি জানান, মিরপুর-১০ থেকে হোপ মার্কেট পর্যন্ত বড় অংশ দখলমুক্ত করা হয়েছে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আরেকটি দায়িত্ব হলো, এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রিত ও মানবিক ব্যবস্থার মধ্যে আনা যায় তা নির্ধারণ করা।
আইন কাদের জন্য
সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও আইনের আশ্রয়ের অধিকার দিয়েছে। পেশা বা ব্যবসার স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকারও দিয়েছে। আবার রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত সীমা টানতে পারে। চলাচলের স্বাধীনতাও সবার জন্য সংবিধানে সুরক্ষিত, যা পথচারীর পক্ষে জোরালো যুক্তি।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ সড়ক ও ফুটপাতের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে দিয়েছে। ১৯৯৯ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্র বনাম বাংলাদেশ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ জীবিকাকে জীবনের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আদালত পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন, কিন্তু বৈধ উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করেননি।
সহজ ভাষায় বললে, সিটি করপোরেশন ফুটপাত খালি করতে পারে, তবে ন্যায্য প্রক্রিয়া মানতে হবে। কোনো পক্ষ সহিংসতা করলে সেই পক্ষের যুক্তি দুর্বল হয়ে যায়। এই লেখা আইনি পরামর্শ নয়। আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
পার্কিং বাণিজ্যে বাড়ছে চরম জনদুর্ভোগ
আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় পার্কিং একটি পরিকল্পিত শহরের মৌলিক অংশ। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক বাণিজ্যিক ভবন ও মার্কেট নির্মাণের সময় নকশায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হলেও পরে সেই জায়গা দোকান, গুদাম বা অন্য বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য জনসাধারণের রাস্তা ও ফুটপাতকে অনানুষ্ঠানিক পার্কিং এলাকায় পরিণত করা হচ্ছে, যা যানজট, পথচারীর ভোগান্তি এবং নগর শৃঙ্খলার অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশ্ন হলো, একটি ভবন থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করা মালিকরা কেন তাদের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থার দায়িত্ব নেবেন না? কেন সাধারণ মানুষকে তার মূল্য দিতে হবে যানজট ও দুর্ভোগের মাধ্যমে? শুধু গাড়িচালকদের জরিমানা করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে, নাকি সেই ভবন মালিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন?
একটি পরিকল্পিত শহর গড়তে হলে রাস্তা দখল নয়, বরং নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য জনসাধারণের জায়গার অপব্যবহার বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।
সমাধান হতে পারে কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন-
- নির্দিষ্ট ভেন্ডিং জোন: যেখানে হকাররা ব্যবসা করতে পারবেন, কিন্তু পথচারীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না।
- সময়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা: অনেক দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফুটপাত বাজার পরিচালনার ব্যবস্থা রয়েছে।
- নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ: কারা ব্যবসা করবেন, কোথায় করবেন, কী ধরনের পণ্য বিক্রি করবেন- এসবের একটি নিয়ম থাকা প্রয়োজন।
- পার্কিং বাণিজ্যে: কোনো মার্কেট বা ভবনের সামনে সরকারি রাস্তা বা ফুটপাতে গাড়ি পার্কিং করলে গাড়িচালকদের জরিমানা করার পাশাপাশি, সেই ভবনের মালিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতায় তাদেরও জরিমানার আওতায় আনতে হবে।
- পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণ: যারা অন্য পেশায় যেতে চান, তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
একটি আধুনিক শহর শুধু চকচকে রাস্তা, উঁচু ভবন ও যানবাহনের গতি দিয়ে তৈরি হয় না। একটি শহরের মান নির্ধারিত হয়- সেখানে পথচারী কতটা নিরাপদ, আর নিম্ন আয়ের মানুষ কতটা সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন তার ওপর।
ঢাকার ফুটপাত সংকট শুধু “দখল বনাম উচ্ছেদ”-এর বিতর্ক নয়। এটি আসলে পথচারীর অধিকার, দরিদ্র মানুষের জীবিকা এবং রাষ্ট্রের পরিকল্পনার সক্ষমতার পরীক্ষা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ফুটপাত খালি করা নয়; দায়িত্ব হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ হাঁটতেও পারবেন, আবার আরেকজন মানুষও সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।

