অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিত পরিদর্শন চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ১০ হাজার ৫৩৩টি স্থাপনা পরিদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৩১৬টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ মোট তিন হাজার ৯৩৮টি ভবন অগ্নিঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাকি ছয় হাজার ৫৯৫টি স্থাপনাকে সন্তোষজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাসসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন বিষয় যাচাই করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে রয়েছে ভবনের জরুরি বহির্গমন পথ, প্রয়োজনীয় ও ব্যবহারযোগ্য সিঁড়ি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পানির রিজার্ভার, স্প্রিংকলার, ফায়ার ডোর, প্রশিক্ষিত জনবল এবং ডেডিকেটেড ফায়ার অফিসার। এ ছাড়া ভবনের আইনগত অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স আছে কি না, তাও দেখা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, এই পরিদর্শনে মূলত অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলোই বিবেচনা করা হয়। সংস্থাটির নিজস্ব কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং উইং নেই। তাই ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণে তৈরি একটি নির্দিষ্ট চেকলিস্টের ভিত্তিতে ঠিক করা হয়, কোনো স্থাপনা সন্তোষজনক, ঝুঁকিপূর্ণ নাকি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিদর্শনে দেখা হয়, ভবনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যবহারযোগ্য সিঁড়ি আছে কি না। সিঁড়ি ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ও বাধামুক্ত কি না এবং জরুরি মুহূর্তে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না, সেটিও যাচাই করা হয়। সিঁড়িতে মালামাল রেখে চলাচলের পথ বন্ধ করে রাখাকে সরাসরি ঝুঁকি হিসেবে ধরা হয়। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কার্যকর কি না এবং সেগুলো চালানোর মতো প্রশিক্ষিত লোক আছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করা হয়।
খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির চিত্র দেখা গেছে পোশাক কারখানায়। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পরিদর্শন করা এক হাজার ৫৩৩টি পোশাক কারখানার মধ্যে ৫৯২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাওয়া গেছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ক্ষেত্রেও চিত্র উদ্বেগজনক। পরিদর্শন করা এক হাজার ৫৩টির মধ্যে ৪৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭৬টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এক হাজার ৭১টি রেস্তোরাঁর মধ্যে ৩৭২টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৪৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এক হাজার ১৭১টি শপিং মল ও মার্কেটের মধ্যে ৩৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলে শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অনুপাতে ঝুঁকি দেখা গেছে রাসায়নিক গুদামে। পরিদর্শন করা ৯১টি কেমিক্যাল গোডাউনের মধ্যে ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ এই খাতের বেশির ভাগ গুদামই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির তালিকায় পড়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনও এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। ২০২৫ সালে পরিদর্শন করা ৬৫২টি সরকারি ভবনের মধ্যে ১৮৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাওয়া গেছে। আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে ৪৭৩টির মধ্যে ১৯০টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও দুর্যোগ-সহনশীলতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তার পাশাপাশি ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, জরুরি বহির্গমন ও দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, অনেক ভবন অনুমোদিত নকশা ও নিয়মকানুন ঠিকমতো না মেনে তৈরি হচ্ছে। আবার নির্মাণের পরও ভবনে নানা পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ফায়ার হাইড্রেন্ট, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, আগুন শনাক্তকরণ সেন্সর, ফায়ার ডোর ও জরুরি বহির্গমনের মতো ব্যবস্থা অনেক ভবনে নেই। তিনি আরও বলেন, কোথাও কোথাও অগ্নিনিরাপত্তার সরঞ্জাম থাকলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। তাই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা দরকার।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে আগুন লাগলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই অবকাঠামোগত নিরাপত্তার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, বিএনবিসি অনুসরণ করে ফায়ার সেফটি প্ল্যান গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে ভবনকে অগ্নিঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।

