দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে জীবনরক্ষাকারী মেডিক্যাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। করোনা মহামারির সময় রোগীদের অক্সিজেন সংকট মোকাবিলায় স্থাপন করা বেশির ভাগ অক্সিজেন প্লান্ট এখন আর সচল নেই। ফলে হাসপাতালগুলোকে আবারও সিলিন্ডার ও তরল অক্সিজেনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোর ৯৯টি অক্সিজেন প্লান্টের মধ্যে বর্তমানে ৬১টি অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ মোট প্লান্টের প্রায় ৬২ শতাংশই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এর ফলে প্রয়োজনের সময় অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সিলিন্ডার ও তরল অক্সিজেন কিনতে হচ্ছে।
রাজধানীর ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী “বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৬”-এর প্রথম দিনে উপস্থাপিত একাধিক পর্যালোচনায় দেশের সরকারি হাসপাতালের অক্সিজেন ব্যবস্থার এই দুর্বল চিত্র উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে “অক্সিজেন প্লান্ট থেকে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা” শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন জাতিসংঘের প্রকল্প সেবা কার্যালয়ের বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মারুফ হাসান।
তার উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলা হাসপাতাল, ২৮টি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৯৯টি প্রেসার সুইং অ্যাডসর্পশন ও ভ্যাকুয়াম সুইং অ্যাডসর্পশন পদ্ধতির অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৭০টি প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মাধ্যমে। এসবের মধ্যে ৪০টি সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এবং ৩০টি বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণের মাধ্যমে স্থাপন করা হয়।
কিন্তু মূল্যায়নে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মাধ্যমে স্থাপন করা ৭০টি প্লান্টের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৯টি চালু রয়েছে। বাকি ৬১টির মধ্যে ৩১টি পুরোপুরি কারিগরিভাবে অচল এবং ৩০টি সচল থাকলেও নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে না।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের প্রকল্প সেবা কার্যালয় সরাসরি নকশা, নির্মাণ ও চালুর দায়িত্ব নিয়ে স্থাপন করা ২৯টি অক্সিজেন প্লান্ট বর্তমানে কার্যকর রয়েছে।
করোনা সংকট থেকে শিক্ষা, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি
করোনা মহামারির সময় দেশে হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের তীব্র সংকট দেখা দেয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসেবে সরকার কোভিড-১৯ জরুরি প্রতিক্রিয়া ও মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্পের আওতায় এসব অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করে।
এই প্লান্টগুলোর উদ্দেশ্য ছিল হাসপাতালেই সরাসরি অক্সিজেন উৎপাদন করা, যাতে বাইরে থেকে সিলিন্ডার বা তরল অক্সিজেন সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
একটি অক্সিজেন প্লান্ট থেকে প্রতি মিনিটে ৫০০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। এই পরিমাণ অক্সিজেন দিয়ে অন্তত ৫০ জন রোগীকে প্রতি মিনিটে ১০ লিটার করে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবে দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালন ব্যবস্থার অভাবে অনেক প্লান্ট অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
দক্ষ জনবল নেই, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি
অক্সিজেন প্লান্ট বন্ধ থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাতটি প্লান্ট এখনো হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়নি। অনেক হাসপাতালে স্থায়ী বাজেট ও প্রশিক্ষিত কারিগরি কর্মী না থাকায় সাধারণ কর্মীদের দিয়ে এসব প্লান্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
সীমিত প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়ে তাদের পক্ষে নিয়মিত ও দীর্ঘ সময় প্লান্ট পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে এবং অক্সিজেনের মান নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তায় স্থাপন করা ২৯টি প্লান্টের কারিগরি জনবলের বেতন সহায়তার মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা থাকবে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এর পর সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এসব প্লান্টের জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব না নিলে বর্তমানে সচল থাকা প্লান্টগুলোও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বছরে কোটি মানুষের প্রয়োজন মেডিক্যাল অক্সিজেন
অক্সিজেনের প্রয়োজন শুধু করোনা রোগীদের জন্য নয়। নিউমোনিয়া, সেপসিস, হৃদরোগ, দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, অপরিণত শিশু জন্ম এবং বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় মেডিক্যাল অক্সিজেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন মেডিক্যাল অক্সিজেন সিকিউরিটির কো-চেয়ার ও আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান জানান, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৯ লাখ মানুষের জরুরি অক্সিজেন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত প্রায় দুই লাখ মানুষের অক্সিজেন প্রয়োজন হয়।
তার মতে, শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি থাকলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও প্রয়োজনের সময় অনেক মানুষ পর্যাপ্ত মেডিক্যাল অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হন।
বড় হাসপাতালগুলোতে সক্ষমতার ঘাটতি
অক্সিজেন প্লান্টের সংখ্যা থাকলেও সব হাসপাতালের চাহিদা অনুযায়ী এর সক্ষমতা সমান নয়।
মূল্যায়নে দেখা গেছে, বর্তমানে চালু ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১টির অক্সিজেন চাহিদা প্রতি মিনিটে ৫০০ লিটার বা তার কম। এসব প্রতিষ্ঠানে একটি মানসম্মত প্লান্ট দিয়েই চাহিদা পূরণ সম্ভব।
তবে বড় হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতি মিনিটে অক্সিজেনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, ৩ হাজার ১৬৫ লিটার।
এর পর রয়েছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ১ হাজার ৭৫০ লিটার, মেহেরপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ১ হাজার ৫৯২ লিটার, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ১ হাজার ৫৫৩ লিটার এবং বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ১ হাজার ১০০ লিটার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্লান্ট স্থাপন করলেই হবে না। হাসপাতালের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা নির্ধারণ, পর্যাপ্ত জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
অক্সিজেন উৎপাদনে মান নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন
দেশের বেসরকারি অক্সিজেন উৎপাদন ব্যবস্থাতেও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৯টি অক্সিজেন প্লান্ট উৎপাদনে থাকলেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, মেডিক্যাল অক্সিজেনের মান নিশ্চিত করতে উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অক্সিজেন একটি ওষুধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এর মান পরীক্ষা, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টেকসই অক্সিজেন ব্যবস্থার জন্য ছয় সুপারিশ
অক্সিজেন ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে অচল প্লান্ট মেরামত করে কেন্দ্রীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা, প্রশিক্ষিত অপারেটর নিয়োগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে জরুরি চিকিৎসায় অক্সিজেন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জীবন রক্ষার অপরিহার্য উপাদান। তাই শুধু সংকটের সময় নয়, সবসময় কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য অক্সিজেন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারি হাসপাতালের অচল অক্সিজেন প্লান্টগুলো দ্রুত সচল করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

