কয়েকজন মেয়ে টং এর দোকানে বসে চা খাচ্ছে। হঠাৎ খেয়াল করলো, একজন ফোন তুলে তাদের দিকে ধরে আছে। তারা প্রথমে ভাবলেন, হয়তো কিছু নয়। কয়েক ঘণ্টা পর সেই ভিডিও ফেসবুকে। ক্যাপশনে হাসি ঠাট্টা, নিচে কমেন্টে তাদের চরিত্র আর কাপড় নিয়ে রায়।
এই দৃশ্য এখন আর বিরল নয়। ভিউ আর আয়ের লোভে কিছু মানুষ রাস্তাঘাট, ক্যাম্পাস আর পার্টিকে কনটেন্টের খনি বানিয়ে ফেলেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে মেয়েদের। তাঁদের না জানিয়েই তাঁদের মুখ ছড়িয়ে পড়ছে হাজারো অচেনা মানুষের মোবাইলে।
ক্যাম্পাস, ডিজে পার্টি, কনসার্ট আর রেস্টুরেন্ট
ফেসবুক খুললেই দেখা যায়, ভুয়া নিউজ পোর্টালে নিজেদের মোজো সাংবাদিক বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর পরিচয় দেওয়া কিছু মানুষ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরে মেয়েদের ভিডিও করেন। ডিজে পার্টি, রেইভ নাইট, কনসার্ট আর রেস্টুরেন্টেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ক্যামেরা মুখের চেয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের দিকেই বেশি থাকে। পোশাক, নাচ বা হাসি কেটে নিয়ে দেওয়া হয় উসকানিমূলক শিরোনাম। করা হয় মেয়েদের ক্যাটকলিং।
এটা সংবাদ নয়। এখানে কোনো জনস্বার্থ নেই। আছে কেবল কৌতূহল ভাঙিয়ে ভিউ কামানোর চেষ্টা। যাঁর ছবি তোলা হচ্ছে, তিনি জানেনও না তাঁর ছবি কোথায় যাচ্ছে।
সাংবাদিকতা আর কনটেন্ট ব্যবসা এক নয়
প্রকৃত সাংবাদিকের ওপর কিছু নিয়ম বাঁধা আছে। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪ অনুযায়ী মানহানিকর বিষয়, বিভ্রান্তিকর তথ্য আর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন সম্প্রচারে নিষিদ্ধ। সংবাদপত্র আর সংবাদ সংস্থার ক্ষেত্রে আছে প্রেস কাউন্সিল আইন ১৯৭৪। সেখানে অভিযোগ করার সুযোগ আছে।
কিন্তু এই নিয়ম মূলত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জন্য। নিজের পেজ বা চ্যানেলে ভিডিও দেওয়া একজন ব্যক্তির ওপর এগুলো সরাসরি প্রযোজ্য নয়। ফলে অনেকে নিজেকে মোজো সাংবাদিক বলে নিয়মের বাইরে থেকে যান। আইনের এই ফাঁক বন্ধ করা জরুরি।
পাবলিক প্লেসে কি গোপনীয়তা থাকে না
যাঁরা অনুমতি ছাড়া ভিডিও করেন, তাদের যুক্তি হলো, রাস্তায় কোনো প্রাইভেসি নেই। আধুনিক আইন এটা মানে না। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত ভন হ্যানোভার বনাম জার্মানি মামলায় ২০০৪ সালে বলেছে, জনসমক্ষেও মানুষের একটি ব্যক্তিগত পরিসর থাকে। শুধু মানুষের কৌতূহল মেটাতে কারও ছবি তোলা, যা কোনো জনস্বার্থের আলোচনায় কিছু যোগ করে না, গোপনীয়তার অধিকার ভাঙতে পারে।
চায়ের দোকানে বসলে মানুষ আপনাকে দেখতে পারে, এটা সত্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি আপনার মুখ রেকর্ড হয়ে ক্যাপশনসহ হাজার মানুষের সামনে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য ১৬ অনুযায়ী, নাগরিকের গোপনীয়তা, সম্মান ও সুনামে স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপ করা যাবে না। বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তিতে সাইন করেছে।
আমাদের সংবিধানেও এর ভিত্তি আছে। অনুচ্ছেদ ৩২ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়। অনুচ্ছেদ ৪৩ গোপনীয়তার অধিকার স্বীকার করে, যদিও সীমিত পরিসরে। অনুচ্ছেদ ৩৯ বাকস্বাধীনতা দেয়, তবে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে।
সাইবার বুলিং আর নৈতিক পুলিশিং
ভিডিও ছড়ানোর পর যা ঘটে, তা অনেক সময় ছবি তোলার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। মন্তব্যের ঘরে শুরু হয় ট্রল। কেউ পোশাক নিয়ে কথা বলে, কেউ চরিত্র নিয়ে। একটি মেয়ে হঠাৎ জনসমক্ষে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যায়।
এটাই ডিজিটাল জগতের নৈতিক পুলিশিং। কে কী পরবে, কোথায় যাবে, কার সঙ্গে হাসবে, তা ঠিক করে দেয় অচেনা দর্শকেরা। এর শিকার মেয়েরা ভয়ে ক্যাম্পাসে যেতে চান না, কনসার্টে যেতে চান না। কেউ কেউ মানসিক চাপে পড়েন, কেউ পরিবারের সামনে বিব্রত হন। এই ক্ষতি টাকায় মাপা যায় না।
বাংলাদেশের আইনে কী প্রতিকার আছে
দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় কারও সুনাম নষ্ট করার মতো অভিযোগ প্রকাশ করা মানহানি। কোনো নারীকে চরিত্রহীন বলা এর আওতায় পড়তে পারে। ৫০৯ ধারায় নারীর শালীনতা ক্ষুণ্ন করে এমন কথা, অঙ্গভঙ্গি বা কাজের শাস্তি আছে। ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে ৫০৬ ধারায় ফৌজদারি ভীতিপ্রদর্শন হতে পারে।
ভিডিও বা ছবি এডিট করে যৌন হয়রানির কাজে লাগানো হলে শাস্তি আরও কঠিন। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ আর সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এ ধরনের বিকৃত বা এআই দিয়ে বানানো যৌন কনটেন্টের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যায়। আইনের ধারা অনুযায়ী ক্ষতিকর কনটেন্ট সরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারে।
দেওয়ানি প্রতিকারও আছে, যদিও খুব কম ব্যবহার হয়। মানহানির মামলায় ক্ষতিপূরণ চাওয়া যায়। কনটেন্ট সরানোর নিষেধাজ্ঞাও চাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ কাজ না করলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্টে রিট করার পথ খোলা।
অন্য দেশ কী করছে
দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুমতি ছাড়া কারও শরীরের ছবি বা ভিডিও তোলা যৌন অপরাধ। ২০১১ সালের বিশেষ আইনে এটি যুক্ত হয়। পরে অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া, ডিপফেক ভিডিও বানানো আর এমন ভিডিও রাখাও শাস্তির আওতায় আনা হয়। দেশটিতে এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা বাড়ায় নারীরা রাস্তায় নেমেছিলেন।
যুক্তরাজ্যে ২০১৯ সালে ভয়ারিজম আইনে স্কার্টের নিচ থেকে ছবি তোলা অপরাধ ঘোষণা হয়। ২০২৩ সালের অনলাইন সেফটি আইনে অন্তরঙ্গ ছবি অনুমতি ছাড়া ছড়ানো বা সাইবার ফ্ল্যাশিং শাস্তিযোগ্য। জাপানে ২০২৩ সালে যৌন উদ্দেশ্যে গোপনে ছবি তোলার বিরুদ্ধে আলাদা আইন কার্যকর হয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পুট্টাস্বামী মামলায় ২০১৭ সালে গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার বলেছে।
এই দেশগুলোর শিক্ষা একটাই। প্রযুক্তি যত সহজ হয়, আইনকে তত স্পষ্ট হতে হয়। অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা আর ছড়ানো, দুটোই আলাদা অপরাধ হিসেবে ধরা জরুরি।
মেয়েরা এখন কী করবেন
এমন কিছু ঘটলে আগে প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। স্ক্রিনশট রাখুন, লিংক রাখুন, পেজের নাম, তারিখ আর মন্তব্য লিখে রাখুন। এরপর প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করুন। তারপর থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করুন।
পুলিশ ব্যবস্থা না নিলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সরাসরি অভিযোগ করা যায়। সাইবার ট্রাইব্যুনাল অনলাইন অপরাধের বিচার করে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেও সংশ্লিষ্ট মামলা চলে। তাৎক্ষণিক বিপদে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করুন। নারী ও শিশু নির্যাতনের পরামর্শে সরকারের ১০৯ হেল্পলাইন আছে। আইনি সহায়তার জন্য আছে ১৬৪৩০।
এখন কী দরকার
আজকের প্রতিকার অনেক সময় ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর কাজে আসে। ভিডিও একবার ভাইরাল হলে তা পুরো মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব। তাই আগেই একটি স্পষ্ট কাঠামো দরকার। প্রকৃত মোবাইল সাংবাদিকতা আর শোষণমূলক কনটেন্ট তৈরির মধ্যে সীমারেখা টানতে হবে।
সেই সঙ্গে আইনের ব্যবহার যেন বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে অস্ত্র না হয়, সেটাও দেখতে হবে। উদ্দেশ্য হবে মানুষের মর্যাদা রক্ষা, সমালোচনা বন্ধ করা নয়। সম্মতি ছাড়া ছবি তোলা, ছড়ানো আর তা দিয়ে আয় করার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।

