ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকট এখন জনসংখ্যা নয়; সংকট হলো—এই বিপুল মানুষকে ধারণ করার মতো শহর আমরা তৈরি করতে পারিনি।
জাতিসংঘের World Urbanization Prospects 2025 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ। ২০০০ সালে যেখানে ঢাকার অবস্থান ছিল বিশ্বের নবম সর্বাধিক জনবহুল শহরের তালিকায়, মাত্র ২৫ বছরের ব্যবধানে তা উঠে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে। আরও ভয়ংকর পূর্বাভাস হলো—২০৫০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ৫ কোটি ২১ লাখে পৌঁছাতে পারে এবং তখন শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরীতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। কিন্তু ঢাকার জন্য এগুলো গর্বের সংবাদ, নাকি সতর্কবার্তা?
প্রশ্নটি এখানেই।
জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু শহর বাড়ছে না
ঢাকায় মানুষ আসছে কাজের জন্য, শিক্ষার জন্য, চিকিৎসার জন্য, ব্যবসার জন্য; আবার নদীভাঙন, বন্যা, লবণাক্ততা কিংবা জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির কারণেও অনেকে ঢাকামুখী হচ্ছেন। অর্থাৎ ঢাকা শুধু একটি রাজধানী নয়, এটি পুরো দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়স্থলেও পরিণত হয়েছে।
কিন্তু একটি দেশের সব সুযোগ যদি একটি শহরে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সেই শহর একসময় নিজের সাফল্যের ভারেই ভেঙে পড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশের নগরায়ণের বড় দুর্বলতা এখানেই। রাজধানীকে বড় করা হয়েছে, কিন্তু বিকল্প নগর অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়নি। ঢাকায় চাকরি, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, ব্যবসা, গণমাধ্যম—সবকিছুর অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন অন্য শহরগুলোকে দুর্বল করেছে এবং ঢাকার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
জাতীয় নগর ফোরাম ২০২৬-এও বিশেষজ্ঞরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অর্থাৎ ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ার গল্পটি আসলে বাংলাদেশের অসম উন্নয়নের গল্পও।
যে শহরে বৃষ্টি মানেই দুর্যোগ
একসময় ঢাকার বৃষ্টি ছিল স্বস্তির। এখন অনেকের কাছে বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু সড়ক ও এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ২০২৬ সালের বর্ষাতেও জলাবদ্ধতায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে, মানুষের স্বাভাবিক জীবন থমকে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন—সমস্যাটি শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়; অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় সংকোচন, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ এবং বিভিন্ন সংস্থার বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাপনাই সংকটকে ভয়াবহ করছে।
আরও বিব্রতকর হলো, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দুই সিটি করপোরেশন ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণে ২৬২ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। তারপরও সামান্য ভারী বৃষ্টিতে শহরের বহু অংশ পানির নিচে চলে যায়।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা কি জলাবদ্ধতার সমাধান করছি, নাকি জলাবদ্ধতা মোকাবিলার প্রকল্পই তৈরি করছি?
যানজটের মূল্য শুধু সময় নয়, অর্থনীতিও
ঢাকার যানজটকে আমরা প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছি। অফিসে যেতে দুই ঘণ্টা, ফিরতে তিন ঘণ্টা—এ যেন নাগরিক জীবনের নিয়ম।
কিন্তু এর অর্থনৈতিক মূল্য কত?
একজন কর্মজীবী মানুষ প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকলে শুধু তার ব্যক্তিগত সময় নষ্ট হয় না; কমে যায় উৎপাদনশীলতা, বাড়ে জ্বালানি ব্যয়, বাড়ে মানসিক চাপ, দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে, যানজটে মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
একটি রাজধানী যদি তার নাগরিকের সময় ফিরিয়ে দিতে না পারে, তাহলে তার অবকাঠামোগত উন্নয়নের বড় বড় স্থাপনা কতটা সফল—সেটিও নতুন করে ভাবতে হবে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকটটি চোখে দেখা যায় না
ঢাকার ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো যানজট বা জলাবদ্ধতাও নয়।
এটি হলো বসবাসের বৈষম্য।
একদিকে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, শিক্ষা ও নাগরিক সুবিধা; অন্যদিকে শহরের প্রান্তে কিংবা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বিপুল মানুষের জীবন—অপর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আবাসনের অনিশ্চয়তা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি বড় অংশ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় এসে এমন অনানুষ্ঠানিক বসতিতে ঠাঁই নিচ্ছেন, যেখানে দুর্বল অবকাঠামো তাদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও এই জলবায়ু-অভিবাসন ও নগর দারিদ্র্যের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়েছে।
অর্থাৎ ঢাকা শুধু মানুষকে গ্রহণ করছে না; মানুষের সঙ্গে তাদের দারিদ্র্য, জলবায়ু ঝুঁকি ও বেঁচে থাকার সংগ্রামও গ্রহণ করছে।
আমরা কি ৫ কোটি মানুষের শহরের জন্য প্রস্তুত?
এই প্রশ্নের উত্তর যদি সৎভাবে দিতে হয়, তাহলে উত্তরটি খুব স্বস্তিদায়ক নয়।
আজকের ঢাকা যেখানে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আগামী কয়েক দশকে ৫ কোটির বেশি মানুষের নগর বাস্তবতা কীভাবে সামলানো হবে?
কোথায় থাকবে তারা?
কোথা থেকে আসবে পানি?
বর্জ্য যাবে কোথায়?
কীভাবে চলবে গণপরিবহন?
কোথায় থাকবে খোলা জায়গা?
কোথায় যাবে বৃষ্টির পানি?
কীভাবে নিশ্চিত হবে সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও শিক্ষা?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই মানুষগুলো কাজ করবে কোথায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ২০৫০ সালের ঢাকা আসলে একটি জনসংখ্যার পূর্বাভাস মাত্র, কোনো নগর পরিকল্পনা নয়।
সমাধান কি ঢাকাকে আরও বড় করা?
কখনোই নয়।
ঢাকাকে বাঁচানোর প্রথম শর্ত হতে পারে ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমানো।
চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহসহ সম্ভাবনাময় শহরগুলোকে শুধু প্রশাসনিক শহর হিসেবে নয়—স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শিল্প, প্রযুক্তি, সরকারি দপ্তর, বেসরকারি বিনিয়োগ—সবকিছু ঢাকায় জমা করে রেখে তারপর যানজট কমানোর চেষ্টা করা মূলত সমস্যার শিকড় অক্ষত রেখে ডালপালা ছাঁটার মতো।
একই সঙ্গে ঢাকার ভেতরে প্রয়োজন একীভূত নগর ব্যবস্থাপনা। রাস্তা এক সংস্থা, ড্রেন আরেক সংস্থা, খাল তৃতীয় সংস্থা, গণপরিবহন অন্য সংস্থা—এভাবে একটি শহর পরিচালনা করা যায় না।
নগর পরিকল্পনাবিদদের সাম্প্রতিক দাবিও একই দিকে—দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা, অনুমোদিত পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিকল্পনা পরিবর্তন বন্ধ করা।
এখনই কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত দরকার
ঢাকাকে টিকিয়ে রাখতে হলে কয়েকটি বিষয়ে আর আপসের সুযোগ নেই।
প্রথমত, খাল, জলাশয়, জলাধার ও বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল দখলমুক্ত করে আইনগত সুরক্ষা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নতুন আবাসন ও বাণিজ্যিক প্রকল্প অনুমোদনের আগে পানি, পয়োনিষ্কাশন, পরিবহন ও পরিবেশগত সক্ষমতা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তৃতীয়ত, ঢাকার বাইরে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি করতে সরকারি বিনিয়োগ ও কর-প্রণোদনা বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, গণপরিবহনকে ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প নয়, বরং প্রধান পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পঞ্চমত, নগর প্রশাসনে সংস্থাগুলোর দায়িত্বের সংঘাত দূর করে একটি শক্তিশালী সমন্বিত কর্তৃপক্ষ বা কার্যকর সমন্বয় কাঠামো তৈরি করতে হবে।
ষষ্ঠত, শহরের প্রতিটি বড় প্রকল্পের সঙ্গে একটি প্রশ্ন বাধ্যতামূলক করতে হবে—‘এটি ২০৫০ সালের ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য করবে, নাকি আরও জনাকীর্ণ?’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জনসংখ্যার নয়, রাষ্ট্রের
৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ ঢাকায় বাস করছে—এটি নিজে কোনো বিপর্যয় নয়। পৃথিবীর অনেক শহরই বিপুল জনসংখ্যাকে পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, গণপরিবহন ও দক্ষ প্রশাসনের মাধ্যমে সামলেছে।
সমস্যা হলো, আমরা ঢাকাকে মানুষ অনুযায়ী তৈরি করিনি; বরং মানুষকে ঢাকার অপ্রস্তুত কাঠামোর মধ্যে ঠেলে দিয়েছি।
তাই ঢাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু জনসংখ্যার সংখ্যা নয়—আমাদের পরিকল্পনার মান, প্রশাসনের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
জাতিসংঘের হিসাব বলছে, ২০৫০ সালে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর হতে পারে। এটি যদি আমাদের গর্বের কারণ হয়, তাহলে একই সঙ্গে এটি আমাদের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তাও।
কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহর হওয়া আর বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর হওয়া—এক জিনিস নয়।
ঢাকার সামনে এখন আসল প্রতিযোগিতা অন্য কোনো শহরের সঙ্গে নয়।
প্রতিযোগিতা হলো—ঢাকা কি আরও ১৫–২০ বছর টিকে থাকার মতো শহর হতে পারবে, নাকি নিজের সাফল্যের ভারেই বসবাসের অযোগ্য এক জনসমুদ্রে পরিণত হবে?
সময়ের উত্তর অপেক্ষা করছে না। ঢাকা অপেক্ষা করছে—আমরা কবে সিদ্ধান্ত নেব।

