বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যখন নিজেদের বহর আরও বড় করার পরিকল্পনা করছে, তখনই উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতির কারণে বিমান তার বর্তমান বহর সচল রাখতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তৈরি করা বোয়িংয়ের একটি পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রাংশ সংকট এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিমানের উড়োজাহাজ পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এমন কিছু যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে উড়োজাহাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে, যেগুলো আরও আগেই মেরামত বা পরিবর্তন করা প্রয়োজন ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা কর্মী এবং আধুনিক উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতিও বিমানের কারিগরি কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। এর ফলে উড়োজাহাজের সমস্যা শনাক্ত করা, সমাধান করা এবং নির্ধারিত সময়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে যাত্রী নিরাপত্তার বড় সংকট তৈরি করছে না। তবে ভবিষ্যতে বিমান যদি বড় বহর পরিচালনা করতে চায়, তাহলে বর্তমান রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো আরও শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ একটি বিমান সংস্থার সক্ষমতা শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনার ওপর নির্ভর করে না, বরং সেই উড়োজাহাজ কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে তার ওপরও নির্ভর করে।
বোয়িংয়ের “বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ৭৭৭/৭৮৭ অনসাইট উন্নত সহায়তা সমাপ্তি প্রতিবেদন”-এ বিমানের বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭ উড়োজাহাজ বহরের রক্ষণাবেক্ষণ পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী একই ধরনের উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশের বহরে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮ এবং দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের উড়োজাহাজ রয়েছে।
বোয়িংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যান্য বোয়িং বহরের তুলনায় বিমানের উড়োজাহাজে কিছু অস্বাভাবিক কারিগরি সমস্যার হার বেশি। এসব সমস্যার কারণে ফ্লাইট বিলম্বের ঘটনাও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিমানকে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণে আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিমানের বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজে যেসব বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে দুটি সমস্যা বৈশ্বিক বহরের সঙ্গেও মিল রয়েছে। এগুলো হলো জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ।
অন্যদিকে বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজে সাধারণ প্রসেসিং ইউনিট, মোটর স্টার্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং হাইড্রোলিক স্পয়লার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ত্রুটি বেশি দেখা গেছে।
বিশ্বব্যাপী বোয়িং ৭৮৭ বহরে সাধারণত কম্পিউটার ইউনিট, যাত্রী আসন এবং বিনোদন ব্যবস্থার সমস্যা বেশি দেখা যায়। কিন্তু বিমানের ক্ষেত্রে জটিল প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাগুলোতেই বেশি ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে।
বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিমানের বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজে ব্রেক নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের সমস্যা বিশ্বব্যাপী বহরের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশি। বৈশ্বিক বোয়িং ৭৮৭ বহরের প্রধান সমস্যাগুলোর তালিকায় এই সমস্যা সাধারণত থাকে না।
একইভাবে উড়োজাহাজের ডানার ওপরের অংশের স্পয়লার ব্যবস্থার ত্রুটির হারও বিশ্বমানের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমস্যা বৈশ্বিক বহরের তুলনায় ছয় থেকে সাত গুণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতি। বোয়িংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার মূল ঘাঁটিতে বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭ উড়োজাহাজের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত নেই।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যন্ত্রাংশের সীমিত প্রাপ্যতার কারণে উড়োজাহাজ পরিচালনা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে এবং নির্ধারিত সময়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
খুচরা যন্ত্রাংশ না থাকায় অনেক সময় উড়োজাহাজের কিছু সমস্যা সাময়িকভাবে রেখে উড্ডয়ন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এর ফলে বিমানের ন্যূনতম সরঞ্জাম তালিকায় থাকা অকার্যকর উপাদানের সংখ্যা বাড়ছে। বোয়িং বলেছে, অনেক ক্ষেত্রে এসব মেরামতের সময়সীমা বারবার বাড়ানো হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিমান বাংলাদেশের সমস্যার জায়গা শুধু যন্ত্রাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি এবং দক্ষ প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীর সংকটও রয়েছে।
বোয়িং সুপারিশ করেছে, নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য কর্মীদের আরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি অভিজ্ঞ পুরোনো কর্মীদের সঙ্গে নতুন কর্মীদের দক্ষতার ব্যবধান কমাতে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, কর্মজীবন উন্নয়ন এবং দক্ষ কর্মী ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রতিবেদনে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকা থেকে হ্যাঙ্গারে পৌঁছাতে প্রকৌশলীদের ২০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে। জরুরি সমস্যার সময় তাদের কাগজের ম্যানুয়াল ব্যবহার করতে হয়, কারণ পর্যাপ্ত ইলেকট্রনিক ম্যানুয়াল ব্যবহারের ব্যবস্থা নেই।
এ ছাড়া হ্যাঙ্গারে পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় উত্তোলন যন্ত্রপাতির ঘাটতিও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে স্থানীয় কারিগরি সহায়তা ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় ঢাকা থেকে প্রকৌশলী ও যন্ত্রাংশ পাঠাতে হয়।
এই সীমাবদ্ধতার একটি উদাহরণ দেখা যায় চলতি বছরের ৭ আগস্ট। টরন্টো থেকে ঢাকাগামী বিমানের একটি বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে কারিগরি সমস্যার কারণে আটকে যায়।
সমস্যা সমাধানের জন্য ঢাকা থেকে দুই প্রকৌশলী ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাঠাতে হয়। এতে প্রায় ২৬০ জন যাত্রী ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় সেখানে আটকে ছিলেন।
এ ছাড়া ২২ আগস্ট ঢাকা থেকে টরন্টোগামী একটি ফ্লাইট রোম হয়ে যাওয়ার পথে ছয় ঘণ্টা বিলম্বিত হয়। বিমানের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ৫ জুলাই থেকে পাঁচ সপ্তাহে কারিগরি সমস্যার কারণে ৩৭টি ফ্লাইট বিলম্বের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব সমস্যার মধ্যে ছিল চাকার সমস্যা, টায়ারের চাপ কমে যাওয়া, কেবিনের চাপ নিয়ন্ত্রণ ত্রুটি, ইঞ্জিন সমস্যা, সেন্সর ত্রুটি, স্পয়লার সমস্যা এবং উইন্ডস্ক্রিনে ফাটল।
এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অ্যাভিওনিক্স প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর মোহাম্মদ আখতার জামিল বলেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না থাকলে প্রকৌশলীরা কোনো উড়োজাহাজকে উড্ডয়নের উপযোগী হিসেবে অনুমোদন দিতে পারেন না।
তার মতে, এই সংকটের পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। হয়তো সময়মতো যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করা হচ্ছে না, অথবা ঘন ঘন কারিগরি সমস্যার কারণে যন্ত্রাংশ দ্রুত ব্যবহার হয়ে যাচ্ছে।
বিমান বাংলাদেশ বর্তমানে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করে নিজেদের বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বহর বড় করলেই হবে না, সেই বহর পরিচালনার জন্য শক্তিশালী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার সফলতা শুধু আকাশে উড়োজাহাজের সংখ্যায় নয়, বরং সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনা, দ্রুত সমস্যা সমাধান এবং যাত্রীদের নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বিমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন উড়োজাহাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।

