দেশের সড়ক থেকে দীর্ঘদিন ধরে অচল ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সরাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেসব গাড়ির ফিটনেস সনদের মেয়াদ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো এখন নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্ক্র্যাপ বা ধ্বংস করা হবে।
এ লক্ষ্যে সরকার প্রকাশ করেছে মোটরযান স্ক্র্যাপ ও পুনর্ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৬। গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই নীতিমালায় অযোগ্য যানবাহন শনাক্ত করা, জব্দ করা, ধ্বংস করা এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য বিস্তারিত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় চলাচল করা অনিরাপদ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর যানবাহন সরিয়ে সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানো। একই সঙ্গে পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ধাতব উপাদান পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনর্ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, শুধু পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ফিটনেস সনদ না থাকা গাড়িই নয়, আরও কয়েক ধরনের যানবাহন স্ক্র্যাপ করার আওতায় আসবে।
যেসব গাড়ির নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে, গুরুতর ক্ষতির কারণে মেরামত করা আর্থিকভাবে লাভজনক নয়, অথবা বারবার নির্ধারিত মাত্রার বেশি দূষণ ছড়ায়—সেসব গাড়িও ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন যানবাহন যেগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে, আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বাতিলযোগ্য গাড়ি, মালিকের স্বেচ্ছায় জমা দেওয়া যান, অনুমোদন ছাড়া তৈরি করা গাড়ি এবং অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করা যানবাহনও এই নীতিমালার আওতায় পড়বে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম রাখা হয়েছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী পরীক্ষায় কোনো যানবাহন এক মাসে তিনবার নির্ধারিত মাত্রার বেশি দূষণ করলে সেটিও স্ক্র্যাপ করার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তবে কোনো গাড়ি সরাসরি ধ্বংস করা হবে না। মালিককে আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে।
যেসব গাড়ির ফিটনেস সনদের মেয়াদ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো জব্দ করার পর সংশ্লিষ্ট মোটরযান নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সাধারণ ক্ষেত্রে গাড়ির মালিককে কমপক্ষে ১৫ দিনের নোটিশ দেওয়া হবে এবং লিখিত আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকবে।
তবে অনুমোদন ছাড়া তৈরি করা গাড়ির ক্ষেত্রে এই নোটিশের নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
স্ক্র্যাপযোগ্য গাড়ির মালিককে নির্ধারিত আবেদনপত্রের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
পরিত্যক্ত, অযোগ্য বা নিয়মিত দূষণকারী যানবাহনের ক্ষেত্রে আদালত, বাংলাদেশ পুলিশ, কাস্টমস এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাও স্ক্র্যাপ করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারবে।
গাড়ি ধ্বংস করার আগে কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যে ওই গাড়ির বিরুদ্ধে কোনো মামলা, বকেয়া অর্থ বা দায়-দেনা রয়েছে কি না।
নতুন নীতিমালায় গাড়ির কর ও অন্যান্য ফি পরিশোধের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো গাড়ি নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার আগেই স্ক্র্যাপ করা হলে মালিককে প্রযোজ্য সব কর ও ফি পরিশোধ করতে হবে।
অন্যদিকে গাড়ির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলে ওই সময়ের পরের বকেয়া কর বা ফি আদায় করা হবে না। তবে আয়ুষ্কালের সময়ের কোনো বকেয়া থাকলে মালিককে নোটিশ পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হবে।
মালিক নির্ধারিত সময়ে বকেয়া পরিশোধ না করলে স্ক্র্যাপ বা নিলাম থেকে পাওয়া অর্থের মধ্য থেকে সেই টাকা কেটে নেওয়া হতে পারে। বাকি পাওনা সরকারি দাবি আদায় আইন, ১৯১৩ অনুযায়ী আদায় করা যাবে।
নতুন ব্যবস্থায় গাড়ির স্ক্র্যাপ মূল্যও নির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালিত হবে। স্ক্র্যাপ বিক্রির অর্থ সরাসরি মালিকের ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে। তবে মালিক শনাক্ত করা না গেলে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
এরপর কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত স্ক্র্যাপ বিক্রেতার কাছে গাড়িটি হস্তান্তর করবে।
স্ক্র্যাপ বিক্রেতার জন্যও নির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। গাড়ির চেসিস নম্বর ও ইঞ্জিন নম্বর এমনভাবে ধ্বংস করতে হবে যাতে সেগুলো অন্য কোনো গাড়িতে পুনরায় ব্যবহার করা না যায়।
তবে ভালো অবস্থায় থাকা যন্ত্রাংশ প্রক্রিয়াজাত করার পর বিক্রি করা যাবে। আর অব্যবহারযোগ্য ধাতব ও অন্যান্য উপাদান পরিবেশবান্ধব উপায়ে সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি করতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, স্ক্র্যাপ বিক্রেতা কাজের আদেশ পাওয়ার পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে বর্জ্য ও অবশিষ্ট উপাদান নিরাপদ উপায়ে অপসারণ করবে।
প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মোটরযান নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ গাড়ির নিবন্ধন বাতিল করবে এবং তাদের ওয়েবসাইটে সেই তথ্য প্রকাশ করবে। পাশাপাশি স্ক্র্যাপ সম্পন্ন হওয়ার সাত দিনের মধ্যে মালিককে সনদ দিতে হবে।
পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সেবা পোর্টালের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থায় গাড়ির পরিচয়, কাগজপত্র যাচাই, অর্থ পরিশোধ, ধ্বংস প্রক্রিয়া, পুনর্ব্যবহার এবং নিবন্ধন বাতিলের সব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অচল গাড়ি রাস্তায় চলাচল করলে তা শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং পরিবেশ দূষণও বাড়ায়। তাই পুরোনো যানবাহনের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে যাত্রীবাহী গাড়ির জন্য বাধ্যতামূলক স্ক্র্যাপ নীতি নেই। বরং নিয়মিতভাবে গাড়ির অবস্থা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটি নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য কি না।
তার মতে, বাংলাদেশেও বিশেষ করে যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে আরও পরিষ্কার নির্দেশনা প্রয়োজন, যাতে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা—দুই বিষয়ই নিশ্চিত করা যায়।
নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা, ফিটনেসবিহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ি সরানোর পাশাপাশি গাড়ির বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে নিয়মের সঠিক প্রয়োগ ও তদারকির ওপর।

