রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে হেনস্তা করে জোর করে কাগজে সই করানোর ঘটনার তিন দিন পর তাঁকে আবার দপ্তরের চেয়ারে বসিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে গিয়ে তিনি নিজে উপাচার্যকে কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই। তারা দুষ্কৃতকারী, সমাজের শত্রু।
বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে ভূমিমন্ত্রী ক্যাম্পাসে পৌঁছান। উপাচার্যের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এমন আচরণ দুর্ভাগ্যজনক। রাজশাহীতে কাউকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উপাচার্যের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, তিনি যেন মনোবল ধরে রাখেন, কারণ রাজশাহীকে সবাই মিলে এগিয়ে নিতে হবে।
ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার। ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্যকে হেনস্তা করে একটি কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হয়। বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য নিজেই ঘটনার বিবরণ দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ জনের একটি দল হঠাৎ তাঁর কক্ষে ঢুকে পড়ে। তারা তাঁকে একটি কাগজে সই করতে বলে, কিন্তু কাগজে কী লেখা আছে তা পড়তে দেয়নি। সই না করলে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকে তিনি সই করেন। তাঁর ধারণা, কাগজটি ছিল তাঁর পদত্যাগপত্র।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার (অর্থ) নাজমুল হোসাইন বাধা দিতে গেলে তাঁকেও লাঞ্ছিত করা হয়। এরপর উপাচার্য ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়। উপাচার্যের দাবি, দপ্তরের কম্পিউটারের সিপিইউ, সিসিটিভি ক্যামেরার সরঞ্জামসহ নানা মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি দপ্তরেও তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
ওই দিন রাতেই নাজমুল হোসাইন বাদী হয়ে রাজপাড়া থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় পঞ্চাশ থেকে ষাট জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সরকারি কাজে বাধা, সরঞ্জাম চুরি এবং ভাঙচুর। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। সেদিন সকালে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপাচার্যকে উপশহরের বাসা থেকে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন। বেলা সোয়া এগারোটার দিকে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফ হোসেনের উপস্থিতিতে উপাচার্যের দপ্তরের তালা খোলা হয়। রাতে মন্ত্রী গিয়ে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারে বসান।
ঘটনাক্রম থেকে বোঝা যায়, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ভয় দেখিয়ে সই আদায়ের মতো ঘটনায় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দল দ্রুত অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রী যখন বলছেন, দুষ্কৃতকারীদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই, তখন তিনি কার্যত বার্তা দিচ্ছেন যে এ ধরনের কাজের দায় কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ঢাকা পড়বে না। তবে মামলার আসামিদের বেশির ভাগই এখনো অজ্ঞাত। তাই শেষ পর্যন্ত কারা এর পেছনে ছিল এবং কতজনকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়, তা-ই হবে এই অবস্থানের আসল পরীক্ষা।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলনও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ অপকর্মের চেষ্টা করলে দল ও মত না দেখে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। স্থানীয় রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রায়ই টানাটানি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দলের একজন জনপ্রতিনিধির এমন বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
চেয়ারে বসার পর উপাচার্য জাওয়াদুল হক বলেন, ঘটনার পরপরই তিনি ভূমিমন্ত্রী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। সবাই তাঁকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
মন্ত্রী এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের পথে আছে। এর মধ্যে একটি বড় প্রকল্প বৃহস্পতিবারই মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প যখন অনুমোদনের পর্যায়ে, তখন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে অস্থিরতা সেই অগ্রগতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। সম্ভবত সে কারণেই মন্ত্রী উন্নয়নের প্রসঙ্গ আর উপাচার্যকে সাহস দেওয়ার কথা একসঙ্গে বলেছেন।
চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন ভূমিমন্ত্রী। তিনি রোগী ও স্বজনদের চিকিৎসকদের সঙ্গে ভালো আচরণ করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, একজন চিকিৎসকের পক্ষে সীমিত সময়ে অনেক রোগী দেখা সম্ভব নয়, তাই চিকিৎসকদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। এ ছাড়া ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল এলাকায় আরও বেশি গাছ লাগানোর ওপর জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ এবং রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম ও মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ইমদাদুল হকও।
সব মিলিয়ে উপাচার্যকে দপ্তরে ফেরানোর মধ্য দিয়ে ঘটনার একটি অধ্যায় আপাতত শেষ হয়েছে। তবে আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলমান। গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের বাইরে বাকি অভিযুক্তদের শনাক্ত করা, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেওয়া প্রশাসনের সামনে বড় দায়িত্ব হয়ে থাকছে।

