হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকাকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্র। গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, এসব অপরাধে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাড়াটে ডাকাত ব্যবহার করছে প্রভাবশালী মাফিয়া চক্র। ভাড়াটেরা মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও নেপথ্যের মাফিয়ারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রবাসফেরত যাত্রী ও ব্যবসায়ীরাই এই চক্রের প্রধান লক্ষ্য।
সম্প্রতি একাধিক আলোচিত ডাকাতির মামলার তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা এই চক্রের সন্ধান পান। তাঁরা জানান, ডাকাতেরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে নিখুঁত ছকে অপরাধ ঘটাচ্ছে। এতে অনেকেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন।
এ ধরনের একটি ঘটনার শিকার চাঁদপুরের দক্ষিণ বালিয়া থানার সামাদ গাজী বাড়ির বাসিন্দা মো. খোরশেদ। গত ৬ জুলাই দুবাইপ্রবাসী ভাইয়ের পাঠানো সতেরো ভরি স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে তিনি বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। শাহবাগ এলাকায় পৌঁছালে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে একদল ডাকাত তাঁকে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর চোখ ও হাত-পা বেঁধে আটত্রিশ লাখ টাকার মালামাল লুট করে তাঁকে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে ফেলে রেখে যায়।
সূত্র জানায়, ডাকাত দল সাধারণত টার্গেট করা ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গাড়ি থেকে নামিয়ে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নেয়। পরে সর্বস্ব ছিনিয়ে নির্জন স্থানে ফেলে দেয়। লুট করা মালামাল নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দিলেই তারা চুক্তির টাকা নগদে পায়। এই চক্রের সদস্যরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসে। এমনকি বিদেশ থেকে এসেও ডাকাতি করে আবার চলে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অপরাধ শেষে তারা দ্রুত ঢাকা ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে গা ঢাকা দেয়।
আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য হলো জামিনের বিষয়টি। অভিযোগ আছে, গ্রেপ্তারের পর জামিনে বের করে আনতে এক শ্রেণির আইনজীবীর সঙ্গে এসব ডাকাতের আগাম চুক্তি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ওই আইনজীবীরা বাকিতে আইনি সহায়তা দেন। গোয়েন্দারা বলছেন, বর্তমানে পেশাদার ডাকাতদেরই ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. ইলিয়াস কবির বলেন, বিমানবন্দরসহ উত্তরা এলাকায় অপরাধ ঘটিয়ে অপরাধীরা দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যায়। অনেক কষ্টে গ্রেপ্তার করার পরও অল্প সময়ের মধ্যে তারা জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ায়। তবে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত থাকায় ডাকাতি অনেকাংশে কমেছে বলে তিনি দাবি করেন।
এই চিত্র থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, অপরাধটি এলোমেলো নয়, বরং পরিকল্পিত ও সংগঠিত। লক্ষ্য ঠিক করা, গাড়ি জোগাড়, পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া, লুটের মাল পৌঁছে দেওয়া এবং পরে জামিনের ব্যবস্থা, প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা লোক ও কাঠামো রয়েছে বলে মনে হয়। এ কারণে শুধু মাঠের ডাকাতদের ধরলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করায় ভুক্তভোগীরা প্রতিরোধ করতে পারছেন না। সাধারণ মানুষ পুলিশ পরিচয় পেলে সন্দেহ করতে চান না। এই আস্থার সুযোগই অপরাধীরা নিচ্ছে। এতে মানুষের মনে আসল পুলিশের প্রতিও অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার ঝুঁকি আছে।
তৃতীয়ত, বারবার জামিনে বেরিয়ে অপরাধে ফেরার প্রবণতা বিচারব্যবস্থার জন্য বড় প্রশ্ন তুলছে। যাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে, তারা কীভাবে দ্রুত মুক্তি পাচ্ছে এবং এর পেছনে কোনো আইনজীবী চক্রের ভূমিকা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তবে এসব অভিযোগ এখনো গোয়েন্দা সূত্রের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল, কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নেপথ্যের মাফিয়াদের শনাক্ত করা। ভাড়াটেরা ধরা পড়লেও যারা অর্থ জোগান দেয় ও পরিকল্পনা করে, তারা অধরা থাকলে চক্রটি নতুন ভাড়াটে জোগাড় করে আবার অপরাধ চালিয়ে যেতে পারে। তাই গ্রেপ্তার ও জামিনের চক্র ভাঙার পাশাপাশি অর্থের উৎস ও যোগাযোগের সূত্র ধরে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনাই হবে পুলিশের আসল পরীক্ষা।
বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরা প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের জন্য এ ঘটনা সতর্ক থাকার বার্তাও বহন করে। কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিলে পরিচয়পত্র যাচাই এবং কাছের থানা বা জরুরি নম্বরে যোগাযোগের সুযোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া যায়। তবে নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের, যাতে বিমানবন্দরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় যাত্রীরা নির্ভয়ে চলাচল করতে পারেন।

