মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি একটি জনসভায় যে স্যুট পরেছিলেন, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দাবি উঠেছে, স্যুটটি বাংলাদেশে তৈরি। নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানার শীর্ষ কর্মকর্তা বলছেন, পোশাকটি তাঁদেরই তৈরি। এতে বিশ্ববাজারে পুরুষদের পোশাক সরবরাহে বাংলাদেশের ভূমিকা নতুন করে নজরে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্প ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এই ঘটনা কতটা সংগতিপূর্ণ, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
পোশাকশিল্পবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেক্সটাইল টাইমস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে জানিয়েছে, গত ৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ শীর্ষক এক সমাবেশে অংশ নেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি মার্কিন জনপ্রিয় পোশাক ব্র্যান্ড জস. এ. ব্যাংকের একটি নেভি ব্লু রঙের স্যুট পরেছিলেন। সমাবেশ চলাকালে একপর্যায়ে তিনি গা থেকে স্যুটের জ্যাকেটটি খুলে ফেলেন। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
আলোচনার কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি স্যুট পাওয়া সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট কেন আমদানি করা পোশাক বেছে নিলেন?
গত বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর, সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে এই প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্যুটটি সম্ভবত বাংলাদেশ কিংবা চীনে তৈরি। সিএনএনের মতে, দেশে উৎপাদনশিল্প ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এমন বার্তা হয়তো পুরোপুরি মানানসই নয়। তবে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট করে কোনো দেশের নাম নিশ্চিত করা হয়নি। সেখানে শুধু সম্ভাবনার কথাই বলা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট দাবি এসেছে বাংলাদেশ থেকে। নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে অবস্থিত ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহির জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পরা স্যুটটি বাংলাদেশেই তৈরি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, একজন ধনকুবের প্রেসিডেন্ট যখন গর্বভরে বাংলাদেশে তৈরি সাশ্রয়ী দামের স্যুট পরেন, তখন তা দেশের কারিগরি দক্ষতা ও কম খরচে উৎপাদনের সক্ষমতার অনেক কিছুই তুলে ধরে।
শরীফ জহির আরও বলেন, এটি দক্ষ কর্মীদের জন্য গর্বের মুহূর্ত। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের গড়ে ওঠা বিশ্বমানের পোশাকশিল্পের সাফল্যেরও প্রতিফলন।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। সিএনএনের প্রতিবেদনে স্যুটের উৎপত্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আর বাংলাদেশের দাবিটি এসেছে সংশ্লিষ্ট কারখানার কর্মকর্তার কাছ থেকে। স্যুটটি যে ওই কারখানাতেই তৈরি, তা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের কোনো তথ্য প্রতিবেদনে নেই। তাই ঘটনাটিকে এখনো নিশ্চিত তথ্য হিসেবে নয়, বরং কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি হিসেবেই দেখা সংগত।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড পুরুষদের স্যুট, জ্যাকেট, ওভারকোট ও ট্রাউজারসহ নানা ধরনের পোশাক তৈরির পূর্ণাঙ্গ সেবাদাতা। তাদের দাবি, পাঁচ লাখ বর্গফুট আয়তনের কারখানাটি বিশ্বে এ ধরনের বৃহত্তম ও অত্যাধুনিক উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর একটি।
ওয়েবসাইটে আরও বলা হয়েছে, কারখানায় স্বয়ংক্রিয় কাটিং ব্যবস্থা এবং বিশেষায়িত সেলাই ও প্রেসিং মেশিন রয়েছে। উৎপাদন ও সংরক্ষণ এলাকার সর্বত্র পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য কনভেয়ারভিত্তিক ব্যবস্থাও ব্যবহৃত হয়। পোশাকশিল্পে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি বৈচিত্র্যময় দলের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি উদ্ভাবনী নকশা, উন্নত কাঁচামাল ও সর্বোচ্চ উৎপাদনমানের সমন্বয়ে ক্রেতাদের জন্য মানসম্মত পণ্য তৈরি করে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষণের দিক থেকে ঘটনাটির দুটি দিক আছে। প্রথমত, বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত রাজনীতিকদের একজনের পোশাক ঘিরে বাংলাদেশের নাম উঠে আসা দেশের পোশাকশিল্পের জন্য এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক প্রচার। বাংলাদেশ এত দিন মূলত টি-শার্ট, জিনস ও নিটওয়্যারের জন্য পরিচিত ছিল। স্যুট, জ্যাকেট ও ওভারকোটের মতো আনুষ্ঠানিক পোশাকে সক্ষমতার বিষয়টি এবার নতুন করে সামনে এল। এ ধরনের পণ্যে বাজার ধরতে পারলে মূল্য সংযোজনের সুযোগও বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আলোচনায়ও জায়গা করে নিয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত পোশাকের উৎস, এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পোশাকটি আসলে কোথায় তৈরি, সে বিষয়ে ব্র্যান্ডের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে বিতর্কটি কতটা ভিত্তিসম্পন্ন, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সব মিলিয়ে একটি স্যুট ঘিরে শুরু হওয়া আলোচনা দুই দেশের দুই ভিন্ন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। একদিকে বাংলাদেশের কারখানার কর্মকর্তারা একে গর্বের মুহূর্ত বলছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এটি রাজনৈতিক বার্তার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্যুটটির উৎপাদনস্থল নিয়ে চূড়ান্ত তথ্য সামনে এলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

