চট্টগ্রামে এক কর্মকর্তা ঘুষের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এক মাসের বেশি সময় ধরে দায়মুক্তি প্রত্যয়নপত্র বা নন-এনকামব্রেন্স সার্টিফিকেট (এনইসি) ইস্যু বন্ধ রয়েছে। ফলে ঋণ অনুমোদন পাওয়ার পরও টাকা ছাড় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। শত শত ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ গ্রাহক পড়েছেন ভোগান্তিতে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তার দাবি, এ কারণে অন্তত ২০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ আটকে আছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুই লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সাব-রেজিস্ট্রার আবদুস সোবহানকে আটক করা হয়। একই অভিযানে কার্যালয়ের প্রধান সহকারী ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপন দাশকেও আটক করা হয়। একটি অংশীদারি চুক্তিপত্রের নিবন্ধন আটকে রেখে ঘুষ দাবির অভিযোগে এই অভিযান চালানো হয়েছিল।
জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এনইসি ইস্যুর দায়িত্বে ছিলেন আবদুস সোবহান। তাঁর গ্রেপ্তারের পর বিকল্প ব্যবস্থায় কার্যক্রম সচল করা যায়নি। ফলে সনদ দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। শুরুতে কিছু আবেদন জমা পড়লেও দীর্ঘদিন সেবা বন্ধ থাকায় এখন নতুন আবেদনও কমে গেছে।
এনইসি না পাওয়ায় ঋণের অর্থ হাতে পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ৫০ লাখ টাকার ঋণ অনুমোদন পেয়েছেন গোপন বৈদ্য। ২০ দিন আগে ঋণ অনুমোদন হলেও কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর তিন সপ্তাহ ধরে তিনি টাকার অপেক্ষায় আছেন।
একই সমস্যায় পড়েছেন আছাদগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী আবু তালেব। জামানতের বিপরীতে তাঁর ৭০ লাখ টাকার এসএমই ঋণ অনুমোদন হয়েছে। কিন্তু দুই সপ্তাহ ঘুরেও তিনি সনদ পাননি। কবে নাগাদ রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স থেকে সনদ মিলবে, তা নিয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ফলে ব্যবসার প্রয়োজনে অনুমোদিত ঋণের টাকা কাজে লাগাতে পারছেন না তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, এনইসি ইস্যু বন্ধ থাকায় অন্তত ২০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ আটকে গেছে। এর মধ্যে ব্যবসায়িক ও গৃহনির্মাণ ঋণ রয়েছে। অনুমোদনের পরও টাকা না পাওয়ায় গ্রাহকদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৪০০টি ঋণের ফাইল এভাবে আটকে আছে।
জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচা এবং স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এনইসি গুরুত্বপূর্ণ নথি। নির্দিষ্ট সময়ের নিবন্ধন রেকর্ড যাচাই করে দেখা হয়, সম্পত্তির ওপর আগে থেকে কোনো নিবন্ধিত দায়, বন্ধক বা হস্তান্তর আছে কি না। মালিকানাসংক্রান্ত ঝুঁকি যাচাই এবং একই সম্পত্তি একাধিকবার বন্ধক রাখার মতো ঝুঁকি শনাক্তেও এই সনদ সহায়তা করে। তাই এটি না থাকলে শুধু ঋণ নয়, সম্পত্তি কেনাবেচাও বাধাগ্রস্ত হয়।
চট্টগ্রাম দলিল লেখক সমিতির এক সদস্য জানান, আইনজীবীদের মাধ্যমে এনইসির আবেদন তাঁদের কাছে আসে। নির্ধারিত সনদ নম্বর দিয়ে আবেদন করা হয়। কিন্তু সনদ ইস্যু বন্ধ থাকায় সম্পত্তি কেনাবেচা ও ব্যাংকঋণ নিতে সমস্যা হচ্ছে।
জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের রেকর্ড কিপার অঞ্জনা সেন বলেন, স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। চান্দগাঁওয়ের সাব-রেজিস্ট্রারকে খণ্ডকালীন দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনি তা পালন করতে চাইছেন না। তবে খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রামের জেলা সাব-রেজিস্ট্রার রেজাউল করিম বকশীর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি, হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও উত্তর দেননি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা বলেন, অনুমোদিত ঋণ সময়মতো ছাড় না হলে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ বাড়বে। তাঁর মতে, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প ব্যবস্থা ও দায়িত্ব বণ্টনের দুর্বলতাই দেখিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনি তদন্তের কারণে নাগরিকদের বৈধ সেবা অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। বিকল্প কর্মকর্তা নিয়োগ, ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সনদ দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। তাঁর ভাষ্য, কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হবে আইন অনুযায়ী, আর নাগরিকদের সেবা সচল রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে একজন কর্মকর্তার গ্রেপ্তারে পুরো একটি সেবাব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার চিত্র সামনে এসেছে। সমাধান কবে হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি। যত দিন স্থায়ী বা বিকল্প কর্মকর্তা নিয়োগ না হচ্ছে, তত দিন চট্টগ্রামে ঋণগ্রহীতা ও সম্পত্তির ক্রেতা-বিক্রেতাদের এই ভোগান্তি চলতেই থাকবে।

