ডার্ক ওয়েবে সক্রিয় একটি সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী জনপ্রিয় ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম পাঠাওয়ের প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য নিজেদের কাছে থাকার দাবি করেছে। একই সঙ্গে এসব তথ্য প্রকাশ না করার বিনিময়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে তারা।
সাইবার গোয়েন্দা প্ল্যাটফর্ম ডেইলি ডার্ক ওয়েবের তথ্য অনুযায়ী, ওই হুমকিদাতা দাবি করেছে, তাদের কাছে পাঠাওয়ের ব্যবহারকারী ও কর্মীদের বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যসহ আরও কিছু ব্যক্তিগত তথ্য।
ডার্ক ওয়েবে সক্রিয় হুমকিদাতারা সাধারণত চুরি করা তথ্য বিক্রি, প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় কিংবা ভবিষ্যতে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের সাইবার হামলা চালিয়ে থাকে।
গত ৭ অক্টোবর ডেইলি ডার্ক ওয়েবে দেওয়া এক পোস্টে ওই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দাবি করে, পাঠাওয়ের মূল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই দিনে পাঠাও জানায়, ৪ অক্টোবরের সাইবার নিরাপত্তা ঘটনার পর কিছু ব্যক্তিগত তথ্য ক্ষতিকর পক্ষের হাতে চলে গেছে।
তবে এই ঘটনায় ঠিক কতজন ব্যবহারকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তা পাঠাও প্রকাশ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কিছু ব্যক্তিগত তথ্য যেমন ব্যবহারকারীর নাম, ই-মেইল ঠিকানা এবং ফোন নম্বর অননুমোদিত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছেছে বলে তারা জানতে পেরেছে।
ডার্ক ওয়েবের ওই পোস্টে দাবি করা হয়েছে, চুরি হওয়া তথ্যভান্ডারের আকার প্রায় ১৩৩ গিগাবাইট। এতে ৫৯১টি টেবিলে প্রায় ২৫ কোটি তথ্যের সারি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হুমকিদাতার দাবি অনুযায়ী, ওই তথ্যভান্ডারে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৯১৮টি ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্টের তথ্য রয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে ব্যবহারকারীর ই-মেইল ঠিকানা, ফোন নম্বর, আইনগত নাম, পাসওয়ার্ডের সংকেতায়িত তথ্য, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ১ কোটি ৯১ লাখ জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ১ কোটি ৯০ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য, ব্যবহারকারীর ছবি, প্রায় ৫৭ লাখ বাসার ঠিকানা, ৫৪৯ জন পাঠাও কর্মীর তথ্য, ১৭ হাজার ৯৪৩টি মার্চেন্ট ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য এবং ৮ লাখের বেশি সরাসরি অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য থাকার দাবিও করা হয়েছে।
তবে এসব দাবির পুরো সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রকাশ করা নমুনা তথ্যের একটি অংশ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেগুলো পাঠাওয়ের গ্রাহক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। তবে পুরো তথ্যভান্ডার সত্যিই পাঠাওয়ের সিস্টেম থেকে নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
সাইবার অপরাধীরা ৪ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার সমান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়ার দাবি করেছে। অর্থ না দিলে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক এবং মানবসম্পদ বিভাগের তথ্য ধাপে ধাপে প্রকাশ করার হুমকিও দিয়েছে তারা।
পাঠাও জানিয়েছে, সাইবার হামলার বিষয়টি শনাক্ত করার পরপরই তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি বাইরের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নিজেদের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে।
পাঠাওয়ের বিপণন বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্রার হাসনাইন জানিয়েছেন, ঘটনাটি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না বলেও তিনি জানান।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ঘটনার পর তাদের সেবা দ্রুত স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে পুরো ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক সমস্যা থাকতে পারে।
ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে পাঠাও জানিয়েছে, তাদের নামে কেউ ফোন, বার্তা বা সন্দেহজনক লিংক পাঠালে তা এড়িয়ে চলতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পাসওয়ার্ড, পিন নম্বর বা এককালীন যাচাইকরণ কোড অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।
জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার পরিচালক মো. হোসাইন বিন আমিন জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠনের কাজ চলছে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেছেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত পাঠাওয়ের সার্ভার পরীক্ষা করা। এটি বাইরের কোনো হ্যাকার নাকি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কারও মাধ্যমে ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও কঠোর সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা প্রয়োজন। কারণ এসব তথ্য ফাঁস হলে ব্যবহারকারীরা পরিচয় চুরি, আর্থিক প্রতারণা এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে পারেন।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর আগে চাকরির ওয়েবসাইট বিডিজবসের তথ্য ডার্ক ওয়েবে প্রকাশের দাবি উঠলেও প্রতিষ্ঠানটি তা অস্বীকার করেছিল।
এ ছাড়া গত মাসে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ঘরের বাজারের ৬ লাখের বেশি গ্রাহকের তথ্য ডার্ক ওয়েব ফোরামে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। এর পাশাপাশি শপনো, টেলিটক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর তথ্য নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সাইবার অপরাধী মহলে আলোচনার খবর এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল সেবার ব্যবহার যত বাড়ছে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার গুরুত্বও তত বাড়ছে। শুধু হামলার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, তথ্য সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
পাঠাওয়ের মতো বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এমন অভিযোগ আবারও দেখিয়ে দিল, ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি শক্তিশালী নীতিমালা, নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।

