খুলনায় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় রাতের বেলা একা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং এক পুলিশ পরিদর্শকের ওপর ছিনতাইকারীদের হামলার পর এই সিদ্ধান্ত এসেছে। বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালনের সময় সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিট প্রধানদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার, ৯ অক্টোবর রাতে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পুলিশ সুপারের স্বাক্ষরে একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে খুলনার রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চলছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটায় সদস্যদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই বিশেষ অভিযান বা অন্য দায়িত্ব পালনের সময় রাতে কোনোভাবেই কেউ যেন একা চলাচল না করেন, তা নিশ্চিত করতে ইউনিট প্রধানদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদেশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের বিভিন্ন শাখা, সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার, জেলা গোয়েন্দা শাখা, ট্রাফিক বিভাগ, পুলিশ লাইন্স, রিজার্ভ অফিস এবং কোর্ট পুলিশ পরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও থানায়।
খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রূপসা থানায় বিশেষ অভিযান শেষে ফেরার পথে এক পুলিশ পরিদর্শক ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন। ঘটনার সময় তিনি সাদা পোশাকে ছিলেন। এই ঘটনার পরই জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্যের নিরাপত্তা বিবেচনায় রাতে একা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে নগরীর খানজাহান আলী সড়কে খুলনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে ধারালো চাপাতির কোপে আহত হন ৪৩ বছর বয়সী পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি কয়েকটি বিষয় সামনে এনেছে। প্রথমত, যিনি নিজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন, সেই পুলিশ কর্মকর্তাও রাতের শহরে নিরাপদ নন। সাদা পোশাকে থাকায় ছিনতাইকারীরা তাঁকে পুলিশ হিসেবে চেনেননি বলেই ধারণা করা যায়। অর্থাৎ হামলাটি সাধারণ ছিনতাইয়ের মতোই ঘটেছে। এতে বোঝা যায়, রাতের বেলায় নগরীতে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি যথেষ্ট বেশি। পুলিশ সদস্য যেখানে আক্রান্ত হচ্ছেন, সেখানে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞার সীমাবদ্ধতা আছে। এটি পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষায় সহায়ক হলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সমাধান নয়। রাতে টহল জোরদার, ছিনতাইপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং অপরাধীদের দ্রুত ধরার ব্যবস্থা না নিলে সমস্যার মূলে হাত পড়বে না। পরিদর্শকের ওপর হামলাকারীরা ধরা পড়েছেন কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য নেই।
তৃতীয়ত, চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চারটি থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চলছে এবং সম্প্রতি বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা দেখা গেছে। তবে একাধিক হামলা ঘটেছে কি না, কিংবা এগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি। চিঠিতে উল্লিখিত পরিস্থিতিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলা হলেও পুলিশ সুপার বলেছেন ছিনতাইকারীদের কথা। এই দুই বিবরণের মধ্যে পার্থক্য আছে এবং তদন্তের পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
সব মিলিয়ে পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষায় নেওয়া এই পদক্ষেপ সময়োপযোগী হলেও নগরের রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এখন নজর থাকবে আহত পরিদর্শকের স্বাস্থ্যের অবস্থা, হামলাকারীদের গ্রেপ্তার এবং খুলনায় রাতের টহল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা জোরদার হয়, সেদিকে।

