প্রতি বছর ১২ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস (World Arthritis Day)। আর্থ্রাইটিস বা বাতজনিত রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের সমস্যা তুলে ধরা এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝানোই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। অনেক মানুষ এখনো মনে করেন, জয়েন্টে ব্যথা, হাঁটতে সমস্যা বা শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া বয়স বাড়ার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আর্থ্রাইটিস শুধু বার্ধক্যের রোগ নয়; এটি শিশু, তরুণ, মধ্যবয়সী ও বয়স্ক- সব বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে।
সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে কিছু ক্ষেত্রে এটি স্থায়ী অক্ষমতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং জীবনযাত্রার মানের অবনতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ শারীরিক শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত, সেখানে জয়েন্ট ও অস্থিসন্ধির সমস্যা সরাসরি মানুষের আয়-রোজগার, পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলে।
আর্থ্রাইটিস কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আর্থ্রাইটিস কোনো একক রোগ নয়; বরং এটি ১০০টির বেশি অস্থিসন্ধি, পেশি ও হাড়-সম্পর্কিত রোগের একটি সমষ্টিগত নাম। সাধারণভাবে এই রোগে জয়েন্টে ব্যথা, প্রদাহ, ফোলাভাব, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং স্বাভাবিক নড়াচড়ায় সমস্যা দেখা দেয়।
আর্থ্রাইটিসের সবচেয়ে পরিচিত ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, গাউট, সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস এবং শিশুদের আর্থ্রাইটিস। প্রতিটি ধরনের রোগের কারণ, উপসর্গ ও চিকিৎসাপদ্ধতি আলাদা। তাই জয়েন্টের ব্যথাকে শুধু সাধারণ সমস্যা হিসেবে না দেখে এর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে বাতজনিত রোগের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে আর্থ্রাইটিস ও অন্যান্য অস্থি-পেশি-জয়েন্টের সমস্যা বর্তমানে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রমের ধরন বদলে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসের কারণে এসব সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে।
জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে Musculoskeletal বা অস্থি-পেশি-জয়েন্ট সমস্যার প্রকোপ নির্ণয় করা হয়। এতে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ১ হাজার ৮৪৩ জন মানুষের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অস্থি-পেশি বা বাতজনিত সমস্যায় আক্রান্ত।
অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৩ জন কোনো না কোনো জয়েন্ট, হাড় বা পেশির সমস্যায় ভুগছেন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে আর্থ্রাইটিস শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বাতজনিত রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কোমর ব্যথা, হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং অন্যান্য জয়েন্টের সমস্যা। জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, কোমর ব্যথার হার প্রায় ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ, হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস প্রায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, সফট টিস্যু রিউম্যাটিজম প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ।
যদিও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের হার তুলনামূলক কম, তবে এটি একটি গুরুতর প্রদাহজনিত রোগ। দ্রুত চিকিৎসা না করলে এটি জয়েন্টের স্থায়ী ক্ষতি, বিকৃতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার কারণ হতে পারে।
গবেষণা, অক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশে বাতজনিত রোগ নিয়ে গবেষণা কয়েক দশক ধরে চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) উদ্যোগে পরিচালিত Community Oriented Program for Control of Rheumatic Disorders (COPCORD) কর্মসূচির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাত ও অস্থিসন্ধির রোগের প্রকোপ, কারণ এবং সামাজিক প্রভাব বোঝার কাজ শুরু হয়।
বাংলাদেশেও ২০০০ সালের পর থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে বাতজনিত রোগ নিয়ে মাঠ পর্যায়ের গবেষণা শুরু হয়। পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব রোগের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। ২০১৫ সালের জাতীয় জরিপ বাংলাদেশের বাত ও অস্থি-পেশির সমস্যার ওপর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হিসেবে বিবেচিত হয়।
আর্থ্রাইটিসের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষমতার ওপর। জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, বাত বা অস্থি-পেশির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ২৪ দশমিক ৮ শতাংশের দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো না কোনো মাত্রার অক্ষমতা ছিল। এছাড়া আক্রান্তদের প্রায় ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ গত এক বছরে কাজ হারানোর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শারীরিক শ্রমনির্ভর পেশায় বিপুল মানুষ যুক্ত, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী জয়েন্ট ব্যথা সরাসরি কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ব্যক্তি, পরিবার এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
আর্থ্রাইটিসের ধরন, চিকিৎসা ও করণীয়
অস্টিওআর্থ্রাইটিস হলো সবচেয়ে সাধারণ জয়েন্টের রোগ। বয়স বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ওজন, পুরোনো আঘাত এবং জয়েন্টের ওপর দীর্ঘদিনের চাপের কারণে জয়েন্টের তরুণাস্থি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। সাধারণত হাঁটু, কোমর, হাতের আঙুল ও মেরুদণ্ডে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। হাঁটাচলা করলে ব্যথা বাড়া, সিঁড়ি উঠতে কষ্ট হওয়া এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া এর সাধারণ লক্ষণ।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলভাবে নিজের জয়েন্টের টিস্যুকে আক্রমণ করে। এর ফলে জয়েন্টে প্রদাহ, ব্যথা ও ফোলাভাব তৈরি হয়। সাধারণত সকালে দীর্ঘ সময় জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকে, দুই পাশের জয়েন্টে সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং রোগীর ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি জয়েন্টের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
গাউট হলো ইউরিক অ্যাসিডজনিত বাত। রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গেলে জয়েন্টে স্ফটিক জমে যায় এবং হঠাৎ তীব্র ব্যথা, ফোলাভাব ও লালভাব দেখা দেয়। সাধারণত পায়ের বুড়ো আঙুল, হাঁটু ও গোড়ালি বেশি আক্রান্ত হয়।
বাংলাদেশে আর্থ্রাইটিস চিকিৎসা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে রিউমাটোলজি বিভাগ চালু হয়েছে। তবে দেশের প্রয়োজনের তুলনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা এখনো সীমিত। অনেক রোগী প্রথমদিকে জয়েন্টের ব্যথাকে সাধারণ সমস্যা মনে করেন এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। ফলে রোগ জটিল হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে আসেন।
আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা রোগের ধরন, বয়স, উপসর্গ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যথা নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ, প্রদাহ কমানোর ওষুধ, ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি ব্যবহার করা হয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে রোগের অগ্রগতি ধীর করার জন্য DMARDs (Disease Modifying Anti-Rheumatic Drugs) এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
ফিজিওথেরাপি আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উপযুক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমে জয়েন্ট সচল রাখা, পেশির শক্তি বৃদ্ধি করা এবং ব্যথা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার, হালকা স্ট্রেচিং, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ রোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘদিন জয়েন্টে ব্যথা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘ সময় শক্তভাব থাকা, হাঁটাচলা বা হাতের কাজে সমস্যা হওয়া, জয়েন্ট লাল ও গরম হয়ে যাওয়া এবং বারবার একই সমস্যা ফিরে আসা—এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এসব সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান পরিহার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় মাছ, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার রাখা উপকারী। একই সঙ্গে নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
সচেতনতাই হতে পারে সুরক্ষার প্রথম ধাপ
বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাত বা জয়েন্টের ব্যথাকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করা যাবে না। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অস্থি-পেশি ও জয়েন্ট সমস্যায় আক্রান্ত, যার প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যের ওপর নয়; কর্মক্ষমতা, অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবনের ওপরও পড়ে।
সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে আর্থ্রাইটিসের প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আর্থ্রাইটিস মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়। সঠিক চিকিৎসা, সচেতনতা ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবারও স্বাভাবিক, সক্রিয় ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন। বিশ্ব আর্থ্রাইটিস দিবস তাই শুধু একটি সচেতনতামূলক দিন নয়; এটি নিজের জয়েন্টের যত্ন নেওয়া এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান।

