সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দেশ ছাড়ার পর নয় বছর পেরিয়ে গেছে। ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে তিনি ঢাকা ছাড়েন, আর ফেরেননি। বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে বসবাস করা এই বিচারপতি নিজের অবস্থাকে ‘ভাসমান মানুষ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো স্বীকৃত অবস্থান নেই, দেশে ফেরার পাসপোর্টও মিলছে না, পেনশনও আটকে আছে।
সম্প্রতি তিনটি দিনে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাদা আলাদা কথোপকথনে তিনি দেশত্যাগ, পদত্যাগের প্রেক্ষাপট এবং চাকরির সুবিধা না পাওয়ার বিষয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারের দিনগুলো ছিল ২৭ আগস্ট, ২ সেপ্টেম্বর এবং গতকাল সোমবার।
বর্তমান অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ: নিজের বর্তমান অবস্থা বোঝাতে গিয়ে সিনহা নিজেকে ‘রিফিউজি’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, শেখ হাসিনার সরকার একটি সাজানো মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। এর ফলে তিনি এখন কোনো আইনি পরিচয় ছাড়াই বিদেশে অবস্থান করছেন।
তিনি জানান, প্রথমে অস্ট্রেলিয়া, তারপর কানাডা, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং আবার কানাডায় ফিরেছেন। এখন কানাডায় ছোট মেয়ের সঙ্গে থাকছেন। তাঁর স্ত্রীর স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা (পিআর) হয়ে গেছে। সিনহার নিজের পিআর অনুমোদন হলেও পুলিশ রিপোর্ট না পাওয়ায় কার্ড ইস্যু হয়নি। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণেই এই জটিলতা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরপরই দেশে ফেরার জন্য তিনি পাসপোর্টের আবেদন করেন বলে জানান। টরন্টোতে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে সর্বশেষ গত ৪ আগস্ট রিমাইন্ডার দিয়ে ইমেইল পাঠানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কোনো উত্তর আসেনি। দুই বছরের বেশি সময় ধরে আবেদন ঝুলে আছে। সিনহা বলেন, তিনি দেশে ফিরতে চান।
প্রধান বিচারপতি হওয়া থেকে পদত্যাগ: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি সিনহা দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। দেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম অমুসলিম প্রধান বিচারপতি। তাঁর মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। কিন্তু মেয়াদ শেষের ৮২ দিন আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। দায়িত্ব পালনের সময় ছিল দুই বছর ৯ মাস ২৫ দিন।
নিয়োগের প্রেক্ষাপট নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত হলো, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার নিজেদের পছন্দের কাউকেই প্রধান বিচারপতি করতে চাইবে, আর সিনহা তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। ওই নির্বাচনে ভোটের আগেই ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দল নির্বাচন বর্জন করেছিল।
তাঁর মেয়াদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি ও রায়ের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি হয়েছিল আপিল বিভাগের চার সদস্যের যে বেঞ্চে, তিনি ছিলেন তার একজন। আর মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড যখন আপিল বিভাগে চূড়ান্ত হয়, তখন তিনিই প্রধান বিচারপতি।
ষোড়শ সংশোধনী ও সরকারের সঙ্গে দূরত্ব :সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব অবশ্য আরও আগে থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েনে বিষয়টি প্রকটভাবে সামনে আসে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে।
২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ নিয়ে রিট হলে হাইকোর্ট সংশোধনীটি বাতিল করেন। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিতে আপিল খারিজ করে দেন। ফলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের বিধান ফিরে আসে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ১ আগস্ট।
সিনহার লেখা রায়ে গণতন্ত্র, রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, সুশাসন, দুর্নীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ নানা বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ছিল। এসব নিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, নেতা ও সরকারপন্থী আইনজীবীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তাঁর পদত্যাগও দাবি করেন। অন্যদিকে বিএনপি রায়কে স্বাগত জানায়।
২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাব পাস হয়। এতে রায় বাতিলের জন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ এবং রায়ে সংসদ ও অন্যান্য বিষয়ে প্রধান বিচারপতির ‘অসাংবিধানিক, আপত্তিকর, অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ’ বাতিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। আগে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আলোচনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ ১৮ জন মন্ত্রী-সংসদ সদস্য সিনহার কড়া সমালোচনা করেন।
পরে রাষ্ট্রপক্ষ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। সেই আবেদন পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগ রায় দেন। এতে বিচারপতিদের অপসারণ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে হওয়ার বিধান পুনর্বহাল থাকে।
প্রথম আলোকে সিনহা জানান, রায় ঘোষণার আগে তাঁকে বঙ্গভবনে চায়ের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১ জুলাই সকালে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন আসে। ফোনদাতা নিজেকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সামরিক সচিব পরিচয় দিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বঙ্গভবনে যেতে অনুরোধ করেন। পরে খুদে বার্তাও আসে। সে অনুযায়ী ২ জুলাই সন্ধ্যায় তিনি সেখানে যান। রাষ্ট্রপতি ছাড়াও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক (বর্তমানে কারাবন্দী) এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম (প্রয়াত) উপস্থিত ছিলেন।
সিনহার দাবি, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের প্রসঙ্গ তোলেন এবং সরকারের পক্ষে রায় দিতে অনুরোধ করেন। সিনহা তখন বলেন, তিনি সরকারের পক্ষে মত দিলেও হাইকোর্টের রায় বাতিল হবে, এর নিশ্চয়তা নেই। কারণ তিনি ও আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা তখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল বারবার চাপ দিচ্ছিলেন, যেন অন্য বিচারকেরা বিপক্ষে গেলেও তিনি সরকারের পক্ষে মত দেন। তিনি অনড় থাকায় প্রধানমন্ত্রী মেজাজ হারান বলে সিনহা উল্লেখ করেন।
আলোচনা একপর্যায়ে উত্তপ্ত হলে তিনি পদত্যাগের কথা বলেন। সিনহার বর্ণনায়, তখন প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই তাঁকে পদত্যাগ না করতে অনুরোধ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রায়ের আগে পদত্যাগ করলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। সেই অনুরোধে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এসব বক্তব্য সিনহার একপক্ষীয় বিবরণ। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘আ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’তেও বঙ্গভবনের এই আমন্ত্রণের কথা উল্লেখ আছে। বইটি তিনি বিদেশে থাকাকালে লিখেছেন।
ছুটি, ‘গৃহবন্দী’ অভিযোগ ও দেশত্যাগ: ২০১৭ সালে অবকাশকালীন ছুটি শেষে সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল ৩ অক্টোবর। তার ঠিক আগের দিন ২ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে এক মাসের ছুটির কথা জানান। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা শুরু হয়। সরকারের এক মন্ত্রী বলেন, শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি ছুটিতে গেছেন। বিএনপি অভিযোগ করে, তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ অক্টোবর ছুটিতে থাকা সিনহা জনসমক্ষে আসেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শারীরিক অসুস্থতার কারণে ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেছেন। এ সময় আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সিনহা অবশ্য ভিন্ন বিবরণ দেন। তাঁর ভাষ্য, ২ অক্টোবর অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে তিনি সকালে আদালতে যান। সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব জানান, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন দুপুর ১২টায় দেখা করতে চান। সিনহা অনুমতি দেন। তাঁর দাবি, ওই কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা বলে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসের ছুটিতে যেতে বলেন। সিনহা তা প্রত্যাখ্যান করেন। সেদিন বাসায় ফেরার পর তিনি গৃহবন্দী হয়ে পড়েন বলে জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে অসুস্থতাজনিত ছুটির কথা বলা হলেও দেশ ছাড়ার আগে ১৩ অক্টোবর রাতে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে ভিন্ন কথা বলেন। তিনি বলেন, তিনি অসুস্থ নন, ভালো আছেন, শুধু বিব্রত। বিচার বিভাগ যেন কোনোভাবে কলুষিত না হয়, সে জন্য তিনি সাময়িকভাবে যাচ্ছেন। লিখিত বিবৃতিতেও তিনি জানান, একটি রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সমালোচনায় তিনি সত্যিই বিব্রত।
পরদিন ১৪ অক্টোবর বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে যা ঘটেছে, তা বিচার বিভাগে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ। এরপর ১০ নভেম্বর বিদেশ থেকে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান।
এখন সিনহা দাবি করছেন, তৎকালীন সরকার তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। তিনি একে সরাসরি ষড়যন্ত্র বলেন এবং বলেন, এতে ডিজিএফআইকে ব্যবহার করা হয়েছিল। তাঁর বর্ণনায়, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান তাঁকে বলেছিলেন, তিনি থাকতে পারবেন না, দেশের বাইরে যেতে হবে। সিনহা বলেন, ডিজিএফআই বা শেখ হাসিনার চোখ রাঙানিকে তিনি ভয় পাননি। তাঁর ভয় ছিল সহকর্মীদের ভূমিকায়। আপিল বিভাগের সহকর্মী বিচারকেরা বঙ্গভবন থেকে ফিরে রাতারাতি তাঁর সঙ্গে বেঞ্চে না বসার কথা জানিয়ে দেন বলে তাঁর অভিযোগ। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতির আর কী থাকে, এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কিছুদিন আগেই তাঁরা একসঙ্গে ষোড়শ সংশোধনীর রায় দিয়েছেন, তারপর হঠাৎ কী হয়ে গেল। তাঁর ভাষায়, তিনি নিশ্বাস নিতে পারছিলেন না।
সিনহার মতে, মূলত ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের জেরেই তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি বলেন, অধস্তন আদালত সরকারের নিয়ন্ত্রণে। মাসদার হোসেন মামলার রায় হলেও অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধি বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণও নির্বাহী বিভাগের অধীনে নিতে ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। তিনি প্রতিবাদ করে রায়ে সংশোধনীকে অবৈধ বলেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, এ কারণেই তাঁর প্রতি সরকারের ক্ষোভ।
চাকরির সুবিধা নিয়েও অভিযোগ আছে সিনহার। তিনি জানান, ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ, অর্থাৎ অর্জিত ছুটি নগদায়ন, তিনি পেয়েছেন। প্রথমে ১২ মাসের অর্থ দেওয়া হয়। বাকি ছয় মাসের অর্থ ও পেনশনের জন্য তিনি কানাডা থেকে আবেদন করেন। ছয় মাসের অর্থ পেয়েছেন, কিন্তু পেনশন মেলেনি।
তাঁর অভিযোগ, পেনশনের জন্য কনসাল জেনারেলের কাছ থেকে তাঁর স্বাক্ষর কাউন্টার সাইন করাতে বলা হচ্ছে। সিনহা একে অপমানজনক বলছেন। তাঁর প্রশ্ন, একজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার কাছে গিয়ে তাঁকে সই করাতে হবে কেন। তিনি আরও বলেন, না খেয়ে মরলেও তিনি কখনো মাথা নত করেননি।
দেশত্যাগের পর সিনহার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়। এর একটিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযোগ ছিল, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) চার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এই মামলায় রায় দেন। দুটি ধারায় তাঁকে সাত বছর ও চার বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সিনহা বলেন, তিনটি মামলার কথা তিনি নিশ্চিত নন, তবে একটি মামলার খবর পেয়েছেন, যাতে সাজা হয়েছে। তাঁর দাবি, উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের বাড়ি বিক্রির টাকায় তিনি ৪ নম্বর সেক্টরে অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন এবং তা আয়কর রিটার্নে দেখিয়েছেন। সম্পূর্ণ সত্য আড়াল করে মনগড়া মামলা সাজানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সিনহার বক্তব্যে যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে, তার অনেকগুলোই তাঁর নিজের বিবরণ। বঙ্গভবনের বৈঠক, ডিজিএফআই প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ, সহকর্মী বিচারকদের বেঞ্চে না বসার সিদ্ধান্ত এবং মামলা সাজানোর অভিযোগ, এসবের কোনোটিই স্বতন্ত্র সূত্রে যাচাই হয়নি। প্রতিবেদনে অন্য পক্ষের বক্তব্যও নেই। তবে ঘটনাপ্রবাহের কিছু বিষয় নথিবদ্ধ। ষোড়শ সংশোধনীর রায়, সংসদে নিন্দা প্রস্তাব, ছুটির প্রজ্ঞাপন এবং দুদকের মামলায় আদালতের সাজার রায়, সবই প্রকাশ্য তথ্য।
আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগের রিভিউ রায়ে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই বহাল থাকে। অর্থাৎ বিচারপতিদের অপসারণ সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেওয়ার ষোড়শ সংশোধনীর বিধান শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি, যদিও সিনহা এর ফল ভোগ করেছেন নিজের কর্মজীবন ও প্রবাস জীবনে।
সব মিলিয়ে সিনহার ঘটনা বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক, বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা এবং একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার অধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে আনে। তাঁর পাসপোর্ট আবেদন দুই বছর ঝুলে থাকা এবং পেনশন আটকে থাকার অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে পুরো চিত্র আরও স্পষ্ট হতো।

