ঢাকার সকাল একসময় শুরু হতো কাকের ডাকে। বাস আর বাজারের হইচই জমে ওঠার আগেই ডাস্টবিনের পাশে জড়ো হতো কাক, সবজির বাজারে ঘুরত ময়না, আকাশে উড়ত চিল, আর খাল ও জলাভূমির ধারে নীরবে হাঁটত বক। বারান্দা, দালান আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে শোনা যেত চড়ুইয়ের কিচিরমিচির। বছরের পর বছর কোটি মানুষের এই শহরে মানুষের সঙ্গেই টিকে ছিল এই পাখিরা।
এখন সেই চেনা চিত্র ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। শহর যত পরিচ্ছন্ন হচ্ছে, শহুরে জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এসব পাখির খাবারের উৎস তত কমছে। এ নিয়ে সম্প্রতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত এক মতামতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় পাখির পুনর্বাসন অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন শিক্ষক ও দুজন শিক্ষার্থী।
লেখকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্যোগ চলছে। খোলা আস্তাকুঁড়ের জায়গায় ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন বসছে, সিল করা ব্যাগে বর্জ্য রাখা হচ্ছে, সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের দিক থেকে এসব পদক্ষেপ জরুরি। দুর্গন্ধ ও রোগবাহী পোকামাকড় কমলে মানুষের জীবনমানও উন্নত হয়। কিন্তু পরিবেশ ঠিক করতে নেওয়া যেকোনো উদ্যোগ আশপাশের বাস্তুতন্ত্রেও প্রভাব ফেলে। যেসব পাখি মানুষের জীবনধারার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল, তারা এখন প্রাকৃতিক জীবনে ফিরে যেতে হিমশিম খাচ্ছে।
অতীতে ঢাকার জৈব বর্জ্যের বড় অংশ খোলা জায়গাতেই ফেলা হতো। সবজির খোসা, মাছের উচ্ছিষ্ট, ভাত, ফলের খোসাসহ নানা খাদ্যবর্জ্য জমত রাস্তার পাশের ডাস্টবিন, ঐতিহ্যবাহী বাজার, নালা ও অনানুষ্ঠানিক ফেলার জায়গায়। এটি দুর্বল ব্যবস্থাপনার লক্ষণ ছিল ঠিকই, তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে তা শহুরে বন্যপ্রাণীর খাবারের জোগানও দিত। মানুষের চোখে যা আবর্জনা, পাখির কাছে তা ছিল মূল্যবান খাদ্য।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো আবর্জনাভোজী ছিল কাক। তবে আরও অনেক প্রজাতি এর ওপর নির্ভর করত। বাজারে পোকামাকড় ও খাবারের কণা খুঁজত ময়না। কসাইখানা ও মাছের বাজারের ওপর চক্কর দিত চিল, মাংসের টুকরোর আশায়। জলাভূমি, নালা ও জলাবদ্ধ ফেলার জায়গায় খাবার পেত বক, কারণ সেখানে পোকা, মাছ ও ব্যাঙ ছিল প্রচুর। চড়ুই আবর্জনাভোজী না হলেও আশপাশের পোকামাকড়, বাগান, গাছ ও বাসা বাঁধার জায়গা কাজে লাগাত। প্রতিটি প্রজাতির পরিবেশগত ভূমিকা আলাদা, কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সবাই নির্ভর করত ঢাকার অনিচ্ছাকৃতভাবে গড়ে ওঠা নগর-পরিবেশের ওপর।
এভাবে আবর্জনা শুধু স্বাস্থ্যের সমস্যা ছিল না, এটি নগরের খাদ্যচক্রেরও অংশ হয়ে উঠেছিল। পাখিরা কখনোই শহরের বর্জ্য সমস্যার সমাধান ছিল না। তবে তারা জৈব বর্জ্যের কিছু অংশ খেয়ে ফেলত, পোকামাকড় ও ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখত এবং এমন সব পরিবেশগত যোগসূত্র তৈরি করত, যা এতটাই সাধারণ যে সহজে নজরে আসত না।
এখন এই ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। ঢাকার অনেক এলাকায় সিটি করপোরেশনের সেবা আগের চেয়ে কার্যকরভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করছে। বর্জ্য ক্রমেই প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিকল্পিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা ধীরে ধীরে কমছে। ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহরের জন্য এগুলো প্রকৃত অগ্রগতি। কিন্তু একই সঙ্গে দশকের পর দশক ধরে পাখিরা যে খাবার পেয়ে আসছিল, তাও বন্ধ হয়ে গেছে।
বড় প্লাস্টিক ব্যাগ খুলে খাবার বের করা কাকের জন্য কঠিন। খোলা খাদ্যবর্জ্য কমে যাওয়ায় ময়নার নাগাল কমেছে। আগে যেখানে ফেলে দেওয়া মাংস পাওয়া যেত, সেসব খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় চিলও সেখানে আর আসছে না। নিষ্কাশনব্যবস্থা ক্রমেই প্রকৌশলনির্ভর হচ্ছে, বর্জ্য আরও দ্রুত সরানো হচ্ছে। ফলে বকের আকর্ষণীয় ভেজা খাবারের জায়গাগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। শহর মানুষের জন্য আরও পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর হচ্ছে, কিন্তু অনেক প্রজাতির পাখির জন্য হয়ে উঠছে আরও দুর্গম।
লেখকেরা বলছেন, এর প্রভাব একাধিক প্রজাতিতে পড়ছে। কারণ, নগরের জীববৈচিত্র্যে খাবার, গাছপালা, পানি ও বাসা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। একটির পরিবর্তন অন্যগুলোকেও প্রভাবিত করে। চড়ুই হারাচ্ছে গাছ ও বাগান। নগরায়ণে জলাভূমি হারাচ্ছে বক। চিলের শিকারের জন্য দরকার খোলা জায়গা, আর ময়না থাকে নানা ধরনের পরিবেশে। নগর পরিকল্পনায় জীববৈচিত্র্যের প্রতি মনোযোগের অভাবই পাখিদের এই পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রবন্ধে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকায় প্রতিদিন বর্জ্য তৈরি হয় ৭ হাজার টন। এর মাত্র ৩৭ শতাংশ সংগ্রহ করা হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভোগের ধরন বদলের কারণে মাথাপিছু বর্জ্য বাড়ছে। পুনর্ব্যবহার খুবই সামান্য, আর ভরাট জায়গাগুলো প্রায় পূর্ণ। রাস্তাঘাট আবর্জনায় ভরে থাকার আগের অবস্থায় ঢাকা ফিরে যেতে পারে না, কারণ বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
তাই সমাধান খোলা আস্তাকুঁড়ে ফেরা নয়। লেখকদের যুক্তি, তাতে স্যানিটেশনে অর্জিত অগ্রগতি উল্টে যাবে। বরং পাখিদের এমন খাবার ও আবাস দরকার, যা অসংগৃহীত বর্জ্যের ওপর নির্ভর করে না। এ জন্য তাঁরা কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন।
সড়ক প্রশস্তকরণ ও পার্ক নতুন করে সাজানোর সময় পরিণত, ফলদায়ী ও পোকা আকৃষ্টকারী গাছ রেখে দিতে হবে। নির্মাণের জন্য জলাভূমি ও খালপাড় ভরাট না করে সংরক্ষণ করতে হবে। পার্ক ও আবাসিক ব্লকের ভেতরে ছোট ছোট অযত্নের জায়গা রাখতে হবে, যেখানে আবর্জনা ছাড়াই পাখি খাবার খুঁজতে ও বাসা বাঁধতে পারে। সিটি করপোরেশন নালা ও বসতবাড়ি থেকে দূরে কাক ও চিলের জন্য নির্দিষ্ট খাবারের জায়গা ঠিক করতে পারে। পাড়াভিত্তিক কম্পোস্ট কেন্দ্র করা যেতে পারে, যেখানে জৈব বর্জ্য ঢেকে রাখা যাবে, অথচ পাখির নির্ভরশীল পোকামাকড়ের খাবারও থাকবে।
কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলবে নতুন ভবনে পাখির বাসাবাক্স বসালে, পার্ক ও খালপাড়ে কীটনাশক ব্যবহারে বিধিনিষেধ দিলে এবং বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের সময় পাখির আবাসকে বিবেচনায় রাখা বাধ্যতামূলক করলে। লেখকদের ভাষ্য, এর কোনোটিই পরিচ্ছন্ন ঢাকার বিরুদ্ধে নয়। ভেবেচিন্তে শহর সাজালে দুটোই সম্ভব।
অন্যান্য শহরের উদাহরণও দিয়েছেন তাঁরা। সিঙ্গাপুর জৈব বর্জ্য পুরোপুরি মাটিচাপা দেয় না, বরং পাড়ায় পাড়ায় কম্পোস্ট করে। এতে রাস্তা পরিচ্ছন্ন থাকে, আবার পার্কে পোকামাকড় ও পাখিও টিকে থাকে। ব্রাজিলের কুরিতিবা বর্জ্য ও পরিবহন পরিকল্পনায় সবুজ করিডর যুক্ত করেছে, ফলে প্রাণীর আবাস সেখানে আকস্মিক নয়, পরিকল্পনারই অংশ। ঢাকাও ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিনের জৈব বর্জ্য উৎসস্থলেই কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে সরাতে পারে বলে মত তাঁদের।
পাখির সংকট শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফল নয়। ঢাকা দ্রুত নগরায়িত হচ্ছে। জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে, পুরোনো বড় গাছ কাটা পড়ছে, খোলা জায়গা পাকা হয়ে যাচ্ছে। লেখকদের মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের চেয়ে আবাস ও খোলা জায়গা হারানোর প্রভাব বাস্তুতন্ত্রে আরও বেশি। কিছু পাখি এখনো ভালো আছে, তবে খাদ্য ও আবাসের অভাবে কিছু প্রজাতি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।
একটি আধুনিক শহরের সাফল্য শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দক্ষতায় মাপা যায় না। দেখতে হবে, শহরে পাখিরা খাবার খুঁজতে ও বাসা বাঁধতে পারছে কি না, সবুজ এলাকা জীবনকে টিকিয়ে রাখছে কি না, নগরের ভেতরে প্রকৃতি এখনো তার ভূমিকা রাখতে পারছে কি না। রাস্তা কতটা পরিচ্ছন্ন বা ভবন কত উঁচু, শুধু তা দিয়ে ঢাকার ভবিষ্যৎ বিচার করা ঠিক হবে না। আকাশে পাখির ডাক ও ওড়াউড়ি আছে কি না, সেটিও বিবেচ্য। শহরে প্রকৃতি ও মানুষের টেকসই সহাবস্থানের জন্য কারও ক্ষতি না করাই জরুরি।
এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকার নগর কর্তৃপক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পাশাপাশি এই বাস্তুতান্ত্রিক দিকটি পরিকল্পনায় আনবে কি না। বিশেষ করে ড্যাপ সংশোধন ও নতুন সড়ক-উদ্যানের নকশায় পাখির আবাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয় কি না, সেটিই নির্ধারণ করবে ঢাকা সত্যিই পরিচ্ছন্ন ও প্রাণবন্ত, দুটোই হতে পারে কি না।

