সাঁইজি লালন ফকিরের তিরোধান দিবসে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর গান গাওয়া কিংবা তাঁর আখড়ায় শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং তাঁর দর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সমাজকে প্রশ্ন করা। যে দেশে লালন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার কথা বলেছেন, সেই দেশে ধর্মের পরিচয়কে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজন কেন বাড়বে? যে মাটিতে লালন জাতপাতের অহংকারকে প্রশ্ন করেছেন, সেই মাটিতে আজও কেন ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে উঠবে?
লালনকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় সার্থকতা এখানেই—তাঁর দর্শনকে জীবনের চর্চায় ফিরিয়ে আনা।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, ভিন্নমতের প্রতি বিদ্বেষ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক বা সামাজিক সংঘাতের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে দেওয়া বক্তব্য এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনা সমাজের পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করে। এসব প্রবণতা শুধু কোনো একটি সম্প্রদায়ের জন্য বিপজ্জনক নয়; এগুলো সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক সংহতি ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যও চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় লালন সাঁইয়ের দর্শন কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানের জন্যও এক জরুরি নৈতিক শিক্ষা।
মানুষ বড়, নাকি মানুষের পরিচয়ের দেয়াল?
লালন ফকিরের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। তাঁর প্রশ্ন ছিল—মানুষকে কি ধর্ম, জাত, বর্ণ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের খাঁচায় বন্দী করে বিচার করা যায়? নাকি মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবিকতা, বিবেক ও কর্মে?
তাঁর বিখ্যাত গান ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ আজও আমাদের প্রচলিত পরিচয়বোধের ভিত নাড়িয়ে দেয়। লালন ধর্মকে কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে খুঁজতে চাননি; তিনি মানুষের ভেতরের সত্য, প্রেম ও আত্মোপলব্ধির সন্ধান করেছেন। তাঁর দর্শনে মানবতা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়, বরং মানুষের সম্মিলিত অস্তিত্বের ভিত্তি।
এখানেই লালন আমাদের সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক।
যে মানুষ অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করে, যে নিজের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে অন্যের অধিকার হরণ করে, যে ভিন্নমতকে দমন করাকে ধর্মরক্ষা মনে করে—সে আসলে বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করছে, নাকি বিশ্বাসকে নিজের ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত করছে? এই প্রশ্ন কেবল ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য নয়; রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক সংগঠক, শিক্ষাবিদ এবং সাধারণ নাগরিক—সবার জন্য।
| ধর্ম পালন ব্যক্তির অধিকার; কিন্তু ধর্মের নামে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। |
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা: উদ্বেগের কারণ কোথায়?
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতি, পোশাক, সাংস্কৃতিক প্রতীক ও ভিন্নমতকে ঘিরে একাধিক বিতর্ক নতুন করে অসহিষ্ণুতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে ঘিরে পোশাকসংক্রান্ত অভিযোগ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ম্যুরাল বিকৃত করার কথিত চেষ্টা নিয়ে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর ৩৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান এবং ধর্মীয় উগ্রতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলাসহ ৩৪টি ঘটনার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ। ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঘটনায় ১১টি মামলায় গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
এই ঘটনাগুলোকে এক সূত্রে গেঁথে কোনো সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে সংঘটিত অপরাধকে উপেক্ষা করাও বিপজ্জনক। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে, অপরাধের প্রমাণ খুঁজতে হবে এবং অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সমস্যা ধর্মবিশ্বাস নয়; সমস্যা তখনই, যখন বিশ্বাসের নামে ঘৃণা ছড়ানো হয়, ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয় কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অন্যের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা চলে।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সংঘাত নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য কীভাবে জনতাকে উত্তেজিত করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
একটি যাচাইহীন পোস্ট, সম্পাদিত ভিডিও কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে পারে। তাই ধর্মীয় অনুভূতির নামে প্রচারিত প্রতিটি বক্তব্যকে সত্য ধরে নেওয়া নয়, বরং তথ্য যাচাই, বিবেকের প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল আচরণই হওয়া উচিত নাগরিকের কর্তব্য।
| সাঁইজি লালন ফকিরের ১৩৬ তম তিরোধান দিবসে আমাদের প্রার্থনা—ধর্মান্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হোক মানুষ, দূর হোক ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন। ভালোবাসা, বিবেক ও মানবিকতায় পূর্ণ হোক জগৎ-সংসার। |
লালনের দর্শন: উগ্রতার বিরুদ্ধে মানবিক প্রতিরোধ
লালন ফকির কোনো আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাংলার মরমি সাধক, যিনি গান ও সাধনার মধ্য দিয়ে মানুষের আত্মপরিচয়, সাম্য এবং ভেদাভেদের অসারতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর দর্শনের শক্তি এখানেই—তিনি মানুষকে অন্যকে ঘৃণা করতে শেখাননি; শিখিয়েছেন নিজের ভেতরের অহংকার ও সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করতে।
লালনের কাছে মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার অন্তর্গত সত্তা ছিল অনুসন্ধানের বিষয়। ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে তাঁর প্রশ্নগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পোশাক, আচার কিংবা সামাজিক পরিচয় দিয়ে মানুষের সম্পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
আজ আমাদের সমাজে এই দর্শনের অন্তত তিনটি শিক্ষা বিশেষভাবে প্রয়োজন।
প্রথমত, ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।
কেউ মসজিদে প্রার্থনা করবেন, কেউ মন্দিরে পূজা করবেন, কেউ গির্জায় যাবেন, কেউ বৌদ্ধবিহারে প্রার্থনা করবেন—আবার কেউ কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করবেন না। নাগরিক হিসেবে সবার মর্যাদা ও অধিকার সমান। এই সমতা শুধু সংবিধানের ভাষায় নয়, সামাজিক আচরণেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিকতা।
ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার আগে তার ধর্ম জিজ্ঞাসা করতে হয় না। বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আগে তার রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করার প্রয়োজন নেই। অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা, নির্যাতিত মানুষের নিরাপত্তা কিংবা অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা—এসবই মানবতার বাস্তব প্রকাশ।
তৃতীয়ত, প্রশ্ন করার সাহস।
ধর্মের নামে প্রচারিত প্রতিটি বক্তব্য, রাজনৈতিক নেতার প্রতিটি দাবি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি উত্তেজক পোস্টকে প্রশ্নাতীত মনে করা বিপজ্জনক। লালনের দর্শন আমাদের অন্ধ অনুকরণের বদলে আত্মজিজ্ঞাসা ও বিবেকের গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে।
শুধু লালনসংগীত নয়, লালনের মূল্যবোধও ছড়াতে হবে
প্রতি বছর লালন স্মরণোৎসবে অসংখ্য মানুষ তাঁর গান শোনেন, তাঁর জীবন ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু উৎসব শেষে যদি আমরা আবারও ধর্মীয় বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়ি, ভিন্নমতকে অপমান করি কিংবা অন্যের অধিকার হরণে নীরব থাকি, তাহলে সেই স্মরণ কতটা অর্থবহ?
লালনকে প্রকৃত অর্থে ধারণ করতে হলে তাঁর গানকে মঞ্চ থেকে সমাজের দৈনন্দিন জীবনে নিয়ে যেতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বৈচিত্র্য, মানবিক মূল্যবোধ ও সহনশীলতা নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে। সংবাদমাধ্যমকে উত্তেজনা ছড়ায় এমন অসমর্থিত তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব শনাক্ত ও প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নেতাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সম্প্রীতির বার্তা দিতে হবে। আর রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে—ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মত কিংবা সামাজিক পরিচয় যা-ই হোক, প্রত্যেক নাগরিক আইনের সমান সুরক্ষা পাবেন।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সম্প্রীতির অর্থ অন্যায়ের সঙ্গে আপস নয়। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগলে তার প্রতিকার চাওয়ার অধিকার রয়েছে; কিন্তু প্রতিকারের পথ হবে আইন, তদন্ত ও ন্যায়বিচার—হামলা, হুমকি কিংবা জনতার বিচার নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে পরস্পরের অধিকারকে সম্মান করেই।
ধর্মান্ধতার অন্ধকার পেরিয়ে মানবতার পথে
বাংলাদেশের পরিচয় কেবল একটি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিচয় নয়। এ দেশের পরিচয় ভাষার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, লোকসংস্কৃতি, বাউল সাধনা, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবোধ, নজরুলের সাম্যচেতনা এবং অসংখ্য মানুষের সহাবস্থানের ইতিহাসে গড়ে উঠেছে।
এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে কাউকে তার বিশ্বাস ত্যাগ করতে বাধ্য করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রত্যেককে নিজের বিশ্বাস ধারণের পাশাপাশি অন্যের বিশ্বাসের অধিকার মেনে নিতে হবে। ধর্মপ্রাণ মানুষ ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ পরস্পরের প্রতিপক্ষ নন; তাঁরা একই সমাজের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করাই প্রকৃত সম্প্রীতি।
লালন সাঁই আমাদের সেই সেতুর কথাই মনে করিয়ে দেন—মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তি হোক ভালোবাসা, সম্মান ও সহমর্মিতা; ঘৃণা, অহংকার ও বিভাজন নয়।
আজ তাঁর তিরোধান দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, আমরা শুধু লালনের গান গাইব না, তাঁর দর্শন দিয়ে নিজেদেরও বিচার করব। আমরা ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়াব না, গুজবের বাহক হব না, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকব না। যে মানুষের পরিচয় ভিন্ন, তার অধিকারও আমাদের কাছে সমান মূল্য পাবে।
কারণ, একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কে কত জোরে নিজের বিশ্বাস ঘোষণা করতে পারে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় সে কতটা সম্মান দিতে পারে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকে।
সাঁইজি লালন ফকিরের ১৩৬ তম তিরোধান দিবসে আমাদের প্রার্থনা—ধর্মান্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হোক মানুষ, দূর হোক ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন। ভালোবাসা, বিবেক ও মানবিকতায় পূর্ণ হোক জগৎ-সংসার।
মানুষের চেয়ে বড় পরিচয় যেন আর কিছু না হয় ‘এই হোক লালন স্মরণের সত্যিকারের অঙ্গীকার’।

