কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যু শুধু একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা তদারকি, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
১৭ অক্টোবর ২০২৬- সকালে উখিয়ার পাটোয়ারটেক এলাকায় রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। কাঠ ও বাঁশের তৈরি রিসোর্টটির বড় অংশ আগুনে পুড়ে যায়। আগুনে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে একই পরিবারের ৬ জন সদস্যসহ শিক্ষার্থীরাও ছিলেন এবং একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রশাসন ঝুঁকির কথা জানত, নাকি জানত না – এমন প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ঝুঁকির কথা জানার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? শুধু নোটিশ দিয়েই কি দায়িত্ব শেষ, নাকি মানুষের জীবন রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুনরায় পরিদর্শনের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছিল?
দুর্ঘটনার পর তদন্ত শুরু হয়, দায়ীদের শনাক্ত করার কথা বলা হয়, নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ আসবে। কিন্তু যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের কাছে এসব পদক্ষেপ আর কতটা অর্থ বহন করবে? আগেই যদি ঝুঁকিটি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যেত, তাহলে কি এই মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন শুধু রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নয়, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকেও প্রয়োজন।

আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতি
বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৭ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনায় পুড়ে যাচ্ছে শত শত কোটি টাকার সম্পদ (সম্পদের ক্ষতি ৬০০ কোটি টাকার বেশি)। সবচেয়ে বেশি আগুন লাগছে ঢাকা বিভাগে। আর মাসের হিসাবে মার্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গত তিন বছরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৪৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আর ২০২৩ সালে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার সম্পদ।

দুর্ঘটনার পরই কেন প্রশাসনের ঘুম ভাঙে?
বাংলাদেশে এমন ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ঢাকার বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজে আগুনে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না, জরুরি বহির্গমনও ছিল অপর্যাপ্ত। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ভবন কর্তৃপক্ষকে তিনবার সতর্ক করার কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে।
২০১৯ সালে বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুনে ২৬ জনের মৃত্যু, একই বছরের পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের মৃত্যু এবং ২০১০ সালে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানির মত প্রতিটি ঘটনা আমাদের সামনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রেখেছে।
বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও বিপজ্জনক প্রতিষ্ঠান চালু থাকে। ২০২৩ সালে ফায়ার সার্ভিস দেশের ৫ হাজার ৩৭৪টি ভবন ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ২ হাজার ১১৮টিকে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল; এর মধ্যে ৪২৪টি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চার বছরে পরিদর্শন করা ২৪ হাজার ১৯৩টি স্থাপনার মধ্যে ৭ হাজার ৮০১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১ হাজার ৮০৩টিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

এই পরিসংখ্যানগুলো পুরোনো সময়ের, বর্তমানের নয়। তবু এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে- ঝুঁকি শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকলেও সেই ঝুঁকি দূর করার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু তালিকা তৈরি, নোটিশ পাঠানো কিংবা সতর্কতামূলক ব্যানার টাঙিয়ে রাখলে মানুষের জীবন নিরাপদ হয় না। প্রশ্ন হলো, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর ক্ষমতা ও সমন্বয় যদি না থাকে, তাহলে পরিদর্শনের আসল উদ্দেশ্য কী?
অনুমোদন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার, আর ব্যর্থতার দায় নেবে কে?
একটি রিসোর্ট চালাতে গেলে শুধু পর্যটকদের থাকার ঘর, খাবারের ব্যবস্থা আর সুন্দর পরিবেশ থাকলেই চলে না। ভবনটি নিরাপদ কি না, আগুন লাগলে মানুষ বেরিয়ে যাওয়ার পথ আছে কি না, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কতটা কার্যকর এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকার বিষয়গুলো নিশ্চিত করাও ব্যবসা পরিচালনার মৌলিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। পর্যটননগরীর পরিকল্পিত উন্নয়ন, ভবনের নকশা অনুমোদন এবং নির্মাণবিধি অনুসরণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। তবে টুপটুপ রিসোর্টের অনুমোদনসংক্রান্ত অনিয়মে কউকের নির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। প্রশ্ন হলো, একটি রিসোর্ট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও চালু থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
কিন্তু বাস্তবে দায়িত্বগুলো অনেক সময় বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে। ভবনের নকশা ও নির্মাণ তদারকি করে এক সংস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা দেখে আরেক সংস্থা, আবার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকে অন্য কর্তৃপক্ষ। এই বিভক্ত দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল হলে এক দপ্তর অন্য দপ্তরের দিকে আঙুল তুলতে পারে, আর সেই সুযোগে ভয়াবহ অনিয়ম চলতে থাকে।

বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পরও ভবনটির ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছিল। কিন্তু সতর্কতা বাস্তবায়নের দায়িত্ব, আইন প্রয়োগের ক্ষমতা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এখানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের আগেই অপরাধী বলা ঠিক হবে না। কিন্তু তদন্তের আওতায় শুধু আগুনের সম্ভাব্য কারণ কিংবা রিসোর্টের মালিকের ভূমিকা নয়, আগে থেকে ঝুঁকির কথা জানার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও থাকতে হবে। কারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের ভূমিকা যাচাই ছাড়া এমন দুর্ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
জবাবদিহিতা কি শুধু মৃত্যুর পর, নাকি তার আগেও?
আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি দুর্ঘটনার পরে নয়, বরং দুর্ঘটনার আগেই। একটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই চলবে, নিরাপত্তার ঘাটতি থাকবে, কর্তৃপক্ষ নোটিশ দেবে, তারপরও ব্যবসা চলবে আর শেষ পর্যন্ত আগুনে প্রাণহানি ঘটলে সবাই নড়েচড়ে বসবে; এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।
পর্যটননির্ভর কক্সবাজারে এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেশি। প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ সেখানে বেড়াতে যান। তাঁদের অনেকে পরিবার ও শিশুদের নিয়ে রিসোর্টে থাকেন। তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেন, যে প্রতিষ্ঠানে অর্থ দিয়ে থাকছেন, সেটি অন্তত মৌলিক নিরাপত্তার শর্ত পূরণ করেছে। কিন্তু সেই আস্থার ভিত্তি যদি যাচাই করা অনুমোদন ও কার্যকর নিরাপত্তার বদলে কেবল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রচারণা হয়, তাহলে পর্যটকের নিরাপত্তা আসলেই কতটা নিশ্চিত?
এখন প্রয়োজন শুধু টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত নয়; কক্সবাজারসহ দেশের পর্যটন এলাকাগুলোর রিসোর্ট, হোটেল ও অন্যান্য আবাসন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই করা। যেসব প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র নেই, যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, কিংবা যেগুলোর জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত রয়েছে- সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিদর্শন করতে হবে। ঝুঁকি পাওয়া গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধনের বাধ্যবাধকতা এবং প্রয়োজন হলে কার্যক্রম বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি কোন প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ঘাটতি কতটা সংশোধন হয়েছে সেসব বিষয়ে তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তদন্ত যেন কেবল কয়েকজন কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠানের মালিককে ঘিরে সীমাবদ্ধ না থাকে। কোথাও দায়িত্বে অবহেলা, নিয়ম প্রয়োগে ব্যর্থতা কিংবা সরকারি দপ্তরের সমন্বয়হীনতা থাকলে সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, আর যেসব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এমন ঘটনা ঘটার সুযোগ তৈরি করে, সেগুলোও সংশোধন করতে হবে।
কারণ মানুষ শুধু দুর্ঘটনার পর বিচার চায় না; তারা দুর্ঘটনার আগেই নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা চায়। একটি পরিবার যখন ছুটি কাটাতে গিয়ে রিসোর্টে ওঠে, তখন তাদের মনে থাকার কথা সমুদ্র, প্রকৃতি আর আনন্দের স্মৃতি- আগুন থেকে কীভাবে প্রাণ নিয়ে পালাতে হবে, সেই ভয় অবশ্যই নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সহজ, কিন্তু এর গুরুত্ব ভয়াবহ: একটি স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ বা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে- এ কথা জানার পরও যদি সেটি চালু থাকে, তাহলে দুর্ঘটনার দায় কি শুধু আগুন লাগার মুহূর্তে উপস্থিত ব্যক্তিদের? নাকি যাঁরা ঝুঁকি শনাক্ত করেও যারা তা দূর করতে পারেননি, তাঁদের দায়িত্বও খতিয়ে দেখা উচিত?
কক্সবাজারের এই অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত, নিরাপত্তা অভিযান কিংবা নতুন নির্দেশনা আসতে পারে। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন তখনই হবে, যখন ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দুর্ঘটনার আগেই থামানো যাবে, অনুমোদন ছাড়া কার্যক্রম চালানো কঠিন হবে এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য সুস্পষ্ট জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ চালানো কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করতে পারাও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। আর সেই সক্ষমতার প্রমাণ দিতে যদি বারবার মানুষের মৃত্যু প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, আমরা কি সত্যিই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলছি, নাকি প্রতিটি বিপর্যয়ের পর সাময়িকভাবে নড়েচড়ে বসেই দায়িত্ব শেষ করছি?

