দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে ফিরে না আসার দায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদসহ সাতজন পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অসদাচরণের অভিযোগে একজন সহকারী পুলিশ সুপারকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে আটজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে সই করেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। সেখানে বলা হয়, পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
হারুন-অর-রশীদ ছাড়া বরখাস্ত হওয়া অন্য কর্মকর্তারা হলেন রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী, লক্ষ্মীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার তারেক বিন রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান, ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন।
বিদেশে গিয়ে আর ফেরেননি দুজন। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ফারহানা তাসকিন ও মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশে অবস্থান করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ফারহানা তাসকিন ডিএমপির প্রশাসন-ট্রাফিক উত্তর বিভাগে সহকারী পুলিশ কমিশনার ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৪২ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে তিনি কানাডায় যান। পরে অসুস্থতার কথা জানিয়ে আরও ৩৬ দিনের ছুটি বাড়ানোর আবেদন করেন। এরপর কানাডার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন বছর মেয়াদি সিপিএ কোর্সে পড়তে শিক্ষাছুটির আবেদন করেন। মন্ত্রণালয় সেই আবেদন নাকচ করে তাঁকে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ছুটি শেষ হওয়ার পরও তিনি কাজে যোগ দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশেরও জবাব দেননি তিনি। পরে সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
অন্যদিকে ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে ২০১২ সালে প্রেষণে যান। পরে কয়েক দফায় তাঁর বিনা বেতনে ছুটি বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আরও দুই বছরের ছুটি চেয়ে আবেদন করেন তিনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই আবেদন নাকচ করে তাঁকে দেশে ফিরে কাজে যোগ দিতে বলে। নির্দেশনা পাওয়ার পরও তিনি দেশে ফেরেননি।
এ ঘটনায় ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়ায় এবং সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শের পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ সর্বশেষ ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তাঁর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ইমেইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কাজে ফেরেননি।
এ ঘটনায় ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশেরও জবাব দেননি তিনি। পরে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী সর্বশেষ ট্যুরিস্ট পুলিশে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তাঁকে রাজশাহীতে রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ২২ জানুয়ারি সেখানে যোগ দিয়ে একই দিন তিন সপ্তাহের বিশ্রামের কথা উল্লেখ করে প্রস্থান প্রতিবেদন জমা দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষে কর্মস্থলে আর যোগ দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩ জুলাই বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। পরে ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নৌ পুলিশে সংযুক্ত হয়ে যোগ দেন। অসুস্থতার কথা জানিয়ে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তাতে ছুটির ধরন, মেয়াদ ও অবস্থানের স্থান উল্লেখ করেননি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দেননি। একাধিকবার নোটিশ পাঠানোর পরও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি।
এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে দুটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
ছুটি শেষে ফেরেননি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। নৌ পুলিশের টাঙ্গাইল অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন এস এম জাহাঙ্গীর হাছান। তিনি ১৫ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর কর্মস্থল ছাড়েন। পরে আরও ৬০ দিনের ছুটি বাড়ানোর আবেদন করলেও তা নাকচ হয়। তবু তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অসদাচরণে সহকারী পুলিশ সুপারের বাধ্যতামূলক অবসর। সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত না করে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। তিনি সিআইডির দিনাজপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন। এর আগে ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক জোনে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিভাগীয় মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২২ সালের এপ্রিলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ওই নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণেও তাঁদের স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে বলে বিভাগীয় নথির সারসংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে।
বিভাগীয় তদন্তে বলা হয়, একজন পুলিশ কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ডে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির ২৫ অক্টোবরের অনুমোদনের পর এ আদেশ জারি করা হয়।

